মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার এক বলধারা ইউনিয়নেই রয়েছে ৩৩টি ইটভাটা। এর মধ্যে বৈধ কাগজপত্র নেই ৮টির। হাইকোর্টে মামলা রয়েছে ৪টির। এগুলো কিছুদিনের মধ্যেই নিষ্পত্তি হবে। তবে তারা ভাটার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ তথ্য দিয়েছেন এখানকার ভূমি অফিসের নায়েব মো:আবু তালেব। চান্দহর ইউনিয়নে রয়েছে ১৯টি ইটভাটা। এর অর্ধেক সংখ্যক ভাটারই নেই পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্র এবং ইট পোড়ানোর লাইসেন্স। বায়রা ইউনিয়নে ১১টি ইটভাটার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এ উপজেলাতে এ ধরনের আরো ইটভাটা আছে, যেগুলো অবৈধ এবং তিন ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে। ধল্লা ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে চর্চা দাগে ২টি ইটভাটা রয়েছে, যেগুলোর কারণে পরিবেশ মারাত্মক দূষিত হচ্ছে। এসব তথ্য দিয়ে সিংগাইরের এসিল্যান্ড হামিদুর রহমান বলেন, নতুন করে আরো ইটভাটা নির্মাণের কার্যক্রম চলছে। এতে করে উপজেলার ১১ ইউনিয়নে ইটভাটার সংখ্যা আনুমানিক একশ-তে গিয়ে পৌঁছাবে। এত ভাটার কারণে ফসলি জমি কমে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের এগিয়ে আসা উচিত। তিনি বলেন, আমরা যতই মোবাইল কোর্টে জেল জরিমানা করি বা অবৈধ ভাটার কার্যক্রম বন্ধ করি না কেন, ভাটার অনুমতি প্রদান করে থাকে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ ছাড়া কৃষি অফিসও সার্টিফিকেট দিয়ে থাকে। অথচ কৃষি অফিসের কোনো এখতিয়ারই নেই ছাড়পত্র দেওয়ার। মামলার বাদী আসলাম হোসেন বলেন, উচ্চ আদালতের এক রিট পিটিশন (নং ১২০২০১১)- এর বলে বলধারা এলাকার ৩টি ইটভাটার সকল কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দেয় আদালত। অথচ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে চলছে ভাটার কার্যক্রম।
কৃষক শফিকুল শিকদার, জহুরুল শিকদার, মরন আলী জানান, চক চান্দহর, মানিকনগর ও রিফায়েতপুর এলাকায় এসব ইটভাটায় শত শত একর জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে করে জমির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে কমে ফসলের উত্পাদন। আগে এসব জমিতে বিঘাপ্রতি সরিষা হতো ১০ মণ। ইরি বোরো ধানের ফলন হতো ২৫ মণ। আমনের ফলন হতো ১০ থেকে ১২ মণ। এসব ভাটার কারণে আশেপাশের গাছপালাও মরে যাচ্ছে। কৃষকরা আরো জানান, ভাটার প্রভাবশালী মালিকেরা তাদের নিয়োজিত দালালদের মাধ্যমে প্রথমে গ্রামের সাধারণ কৃষকদের প্রলোভন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে ৩ ফসলি জমি ক্রয় করেন এবং ভাড়া নিয়ে থাকেন। এরপর জমিগুলো এমনভাবে ভেক্যু দিয়ে কাটা হয় যাতে করে পাশের জমি ভেঙে যায়। তখন পাশের জমির মালিক ভাটার মালিকের কাছে অল্প দামেই জমি বিক্রি করতে বাধ্য হন।
জানা গেছে, ভাটা চালু করার বৈধ কাগজপত্র পেতে হলে প্রথমেই যেতে হয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানরা ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা করে আদায় করে থাকেন (যদিও সকলেই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন)। এরপর লাইসেন্স ও অনাপত্তিপত্র নিয়ে ওই জমিতে ইটভাটার কার্যক্রম শুরু করেন ভাটার মালিকরা।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন- ২০১৩ অনুযায়ী কৃষি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। বসত বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এলজিইডি সড়ক থেকে ভাটার দূরত্ব হতে হবে কমপক্ষে ১ কিলোমিটার। দুই একরের কম জমিতে ভাটা করা যাবে না। সরকারি টার্গেট এর বেশি ইট পোড়ানো যাবে না। কিন্তু কোনো আইন মানা হচ্ছে না। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভাটা মালিকেরা অসাধু সরকারি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ইট পোড়ানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে সরকার হারাচ্ছে মোটা টাকার রাজস্ব।
ভাটার মালিকরা বলেন, সব নিয়ম মেনে ইটভাটা চালু করা সম্ভব না। চালু করা গেলেও এলআর ফান্ড থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে টাকা দিতে হয়।
