গণমানুষের নেতা মওলানা ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। সময়টা একদিকে পরাক্রান্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বর্ণকাল, অন্যদিকে তখন উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটেছিল সাবলীলভাবে। তখন রাজনৈতিক নেতাদের প্রায় সবাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, অভিজাত ও সামন্ত পরিবারের মানুষ। কেউ বড় জমিদার, শিল্পপতি-ব্যবসায়ী, উকিল-ব্যারিস্টার প্রভৃতি। ভাসানীই ছিলেন ব্যতিক্রম।
ভাসানীর জন্ম সিরাজগঞ্জের এক গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। সিরাজগঞ্জ শহরের উপকণ্ঠে ধানগড়া গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেকালের রীতি অনুযায়ী বাংলা ছাড়াও আরবি, ফারসি ভাষাও শিখেছিলেন কিছুটা। এক সুফি সাধক সৈয়দ নাসিরউদ্দিন বোগদাদির সংস্পর্শে আসেন তিনি। বোগদাদি তাকে সঙ্গে নিয়ে যান আসামের জলেশ্বরে। একাডেমিক ইসলামের সঙ্গে পরিচয় হয় বোগদাদি সাহেবের প্রভাবে। ইসলামের আধ্যাÍিক বিষয় কোরান-হাদিস-ফিকা প্রভৃতি জ্ঞানের পাশাপাশি আরবি ও উর্দু ভাষায় জলেশ্বরের দিনগুলোতেই সরগড় হয়ে ওঠেন আবদুল হামিদ। সৈয়দ নাসিরউদ্দিন বোগদাদি আরো উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে পাঠিয়ে দেন ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে। মাত্র দুই বছর ছিলেন, উচ্চশিক্ষা তিনি সম্পন্ন করেননি। সেই প্রয়োজনও বোধ করেননি। তবে দেওবন্দে গিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবিরোধী স্বাধীনতাকামী ভারত খ্যাত আলেমদের সংস্পর্শেই বদলে যায় আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবনদর্শন। একই সঙ্গে তিনি কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট, যিনি ক্যামব্রিজের গ্র্যাজুয়েট হলেও মাওলানা উপাধিতে ভূষিত ছিলেন, সেই মাওলানা মোহাম্মদ আলীর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শামিল হন। পাশাপাশি স্বরাজ পার্টির নেতা, বেঙ্গল প্যাক্ট প্রণেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসেন। নেতাজি সুভাষ বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এঁদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই সব যুগস্রষ্টা নেতার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের প্রভাব মওলানা ভাসানী শেষ জীবনেও ঋণ হিসেবে স্বীকার করে গেছেন।
মওলানা ভাসানীর শিক্ষা-চিন্তার প্রথম বাস্তব প্রয়োগ করেছিলেন তার কিংবদন্তিতুল্য নেতৃত্বাধীন দেশ আসামে। আসামে তখন সেভাবে তেমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। আদর্শভিত্তিক স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি রেশম উৎপাদনে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন। ত্রিশের দশকেই তিনি কর্মমুখী উৎপাদনশীল শিক্ষাজীবনের নজির আসামে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ভারতের উত্তর গোরখপুরের ব্যতিক্রমধর্মী বিপ্লবী ধ্যানধারণার চিন্তানায়ক আল্লামা আজাদ সোবহানী ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে ১৯৩৬ সালে মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ পান। সঙ্গে নিয়ে যান সেদিনের ভাসানচরের বিদ্রোহী মওলানাকে। এর পরের বছর ১৯৩৭ সালে বিশ্বকবির শান্তিনিকেতনে যান তদানীন্তন প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে। মওলানা ভাসানী নিজ দেশের দেওবন্দ ও আলীগড়কে দাঁড় করিয়ে দেখলেন আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়কে। শান্তিনিকেতন সেখানে নতুন মাত্রা যোগ করল। তার চিন্তায় অনুক্ষণ একটি ছবি ভাসতে লাগল। দেওবন্দের আধ্যাÍিক ঐতিহ্য, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও শান্তিনিকেতনের মানবিক নৈসর্গিক আবেদন মিলিয়ে একটি শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা। আসামে তার প্রতিষ্ঠিত স্কুল-কলেজে খণ্ড খণ্ড আল আজহার, দেওবন্দ, শান্তিনিকেতন দেখা যেতে লাগল।
জাতীয় রাজনীতিতে মওলানা ভাসানী ৩০-৪০ দশক থেকে আজীবন যে ভূমিকা রেখে এসেছেন, তার সেই সুদূরপ্রসারী কর্মপ্রবাহে তার শিক্ষা, চিন্তা ও স্বপ্নকে জিইয়ে রেখেছিলেন। সন্তোষে শুরু করেছিলেন শিশু শিক্ষা দিয়ে, লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছাবেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মওলানা ভাসানী উন্নত দেশসমূহ ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাকে সমৃদ্ধ করেছিল। ১৯৫৪-১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানী টানা ১০ মাস ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাটান। লন্ডনে ও স্টকহোমে বিশ্ববরেণ্য বহু গুণীজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, আলোচনা হয়। ১৯৫৭ সালের ৯ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত এতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক অধিবেশনে মওলানা ভাসানী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শিক্ষা ও সংস্কৃতির জাতীয় স্বরূপ কী হবে, সে বিষয়ে আলোচনা করার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানান। সেই আমন্ত্রণে টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত গ্রাম কাগমারীতে এসে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন মিসরের ড. হাসান হাবসি, কানাডার ড. চার্লস জে. এডমস, ব্রিটেনের ড. এফ এইচ কওসন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেভিড গার্থ, ভারতের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবির, কাজী আবদুল ওয়াদুদ, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, নরেন্দ্র দেব, প্রবোধ কুমার স্যানাল, পূর্ব বাংলার ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কুদরত-ই-খুদা, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. মাহমুদ হোসেন, ড. জি সি দেব, ড. আখলাখুর রহমান, ড. মুহম্মদ ওসমান গণি প্রমুখ।
এই অধিবেশনেই মওলানা ভাসানী ঘোষণা দিয়েছিলেন কাগমারী-সন্তোষ এলাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন। ১০ ফেরুয়ারি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন-ভিন্নধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ফিডার ইনস্টিটিউশন হিসেবে এতদাঞ্চলে স্কুল-কলেজ স্থাপন করবেন। মওলানা ভাসানী কাগমারী সম্মেলনে পাওয়া খাদ্যসামগ্রীর উদ্বৃত্ত অংশের বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে প্রথমে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শিক্ষাগুরুর নামে ‘মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ’।
১৯৬৩-৬৪ পরপর দুই বার মওলানা ভাসানী চীন সফর করেন। এছাড়া সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের অনেক দেশ তিনি সফর করেন। প্রেসিডেন্ট নাসেরের আমন্ত্রণে মিসর সফরকালে আবারও তিনি আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। এসব অভিজ্ঞতায় তিনি জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানার আদিবাসী বুনা অধ্যুষিত এলাকা মহীপুরে বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কৃষি, উদ্যান, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প ইতাদিকে ভিত্তি করে তিনি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। গ্রামভিত্তিক কর্ম ও উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থার নজির স্থাপনই ছিল মওলানা ভাসানীর লক্ষ্য। হাসপাতাল, মুসাফিরখানাসহ প্রাইমারি থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত আলাদা স্কুল-কলেজ স্থাপন করেন। এসব ব্যাপক কর্মযজ্ঞ করেন তিনি ‘হক্কুল ইবাদ’ মিশনের আওতায়। ছাত্র-শিক্ষক-কর্মী সবার মধ্যে নৈতিক চেতনা, শ্রম ও সাম্যের প্রতি মর্যাদাবোধ, জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি সমবেদনা ও সেবার মনেবৃত্তি অনুশীলনই ছিল এই মিশনের আদর্শ। সেখানে মওলানার প্রতিষ্ঠিত হাজি মুহাম্মদ মুহসীন ডিগ্রি কলেজ, স্কুল এখনো রয়েছে, কিন্তু ত্যাগী নিষ্ঠাবান আদর্শ কর্মীর অভাবে মিশনের উৎপাদন ও সেবা বন্ধ।
১৯৬৯ সাল থেকে মওলানা ভাসানী ঐকান্তিক ইচ্ছা প্রকাশ করতে থাকেন সন্তোষে নার্সারি থেকে পিএইচডি পর্যন্ত এক অনন্য আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলবেন, যার নামকরণ হবে ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’। ১৯৭০-এর জুনে তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় ‘আমার পরিকল্পনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ শিরোনামে মওলানা ভাসানীর বিশ্লেষণধর্মী লেখায় তিনি বলেন, ‘আজকাল মাদ্রসা শিক্ষা বলিতে যাহা বুঝায় ইসলামী শিক্ষা তাহা নহে।’ ১৯৭১ সালের ২৭ ফেরুয়ারি সন্তোষের দরবার হলে শিক্ষা ও কৃষ্টি সম্মেলনে এক লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘পুঁজিবাদের ধারক-বাহক ঔপনিবেশিকতাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীরা দেশে শাসন-শোষণ অব্যাহত রাখা ও কেরানিকুল সৃষ্টি করার জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করিয়াছিল, আমরা অন্ধভাবে সেই শিক্ষানীতিই অনুসরণ করিয়া চলিয়াছি। এই শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্ম ও নৈতিকতার কোনো স্থান নেই, ধর্মীয় শিক্ষার নামে জীবনের সঙ্গে সম্পর্করহিত তথাকথিত মাদ্রাসা শিক্ষা প্রবর্তন করিয়া সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় সুকৌশলে আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বিতৃষ্ণা জš§ানো হইয়াছে।’ মওলানা ভাসানী রেখে যান সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ ৩৭ নম্বর আইনে পাশ করল ‘মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।’
সার্বিকভাবে আজকের রাজনীতিতে যে দেউলিয়াপনা বিরাজ করছে, তা থেকে মুক্তি পেতে এদেশের মানুষকে মওলানা ভাসানীর শিক্ষা ও রাজনীতির ধারায় এগিয়ে যেতে হবে। সেটি পারলে তবেই তাকে প্রকৃত সম্মান জানানো হবে। বিনম্র শ্রদ্ধা মজলুম জননেতার প্রতি।
লেখক: শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল

