গালি, বুলি ও ভাষা 

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০৮:৪৮

অনেকেই মনে করেন, মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হলো ভাষা বা ভাষার ব্যবহার| মানুষ অন্য সব প্রাণী থেকে এগিয়ে, তার অন্যতম প্রধান কারণ মানুষের ভাষাজ্ঞান| ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সভ্যতার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটেছে| ভাষা ব্যবহার করেই মানুষ হয়েছে বিখ্যাত, জাতিগতভাবে উন্নত| সক্রেটিস যদি ভাষাহীন হতেন, গ্যালিলিও যদি তার বিশ্বাসের কথা না বলতে পারতেন, তাহলে সম্ভবত তাদের ওভাবে মরতে হতো না| ভাষা না থাকলে জন্ম হতো না কোনো ধর্মগ্রম্হ কিংবা দর্শনশাস্ত্রের| ভাষা না থাকলে বিখ্যাত হতেন না শেক্সপিয়ার, হোমার, মিল্টন, রবীন্দ্রনাথ, গ্যেটে, হেমিংওয়ে, তলস্তয়সহ পৃথিবীর তাবত্ কবি-সাহিত্যিক| ভাষা না থাকলে আমরা চিনতাম না প্লেটো, ফ্রয়েড, ডারউইন, কার্ল মার্কসদের| ভাষার মধ্য দিয়েই আন্দোলন করেছেন লেলিন, মাও, হো চি মিন, গান্ধী, ম্যান্ডেলা, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারাসহ পৃথিবীর তাবত্ যোদ্ধা| বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেসকোর্স ময়দানের সেই ৭ই মার্চের মহাকাব্যিক ভাষণ :‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’| বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের পথ বাতলে দিয়েছে কেবল ভাষার নিপূণ ব্যবহারের মধ্য দিয়েই| আবার এই ভাষা ব্যবহার করে হিটলার-মুসোলিনি ঘটিয়েছিলেন পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ| কাজেই দেখা যাচ্ছে, ভাষা হলো সমাজ-সভ্যতা বিকাশের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার, আবার টিকে থাকার প্রধান ঢালও| মানুষ ভাষাহীন হলে পৃথিবীর ইতিহাস হয়তো ভিন্নতর হতো|

কিন্তু ভাষা ব্যবহারে সংযত ও ব্যাকরণনিষ্ঠ না হয়ে দিনে দিনে আমরা ভাষা প্রয়োগে কেমন বেসামাল হয়ে উঠছি| আমরা ক্রমেই আমাদের মুখের বুলিকে গালিতে পরিণত করেছি| এ ব্যাপারে আমাদের দেশের কিছু কিছু রাজনীতিবিদ নিরন্তর ভূমিকা পালন করছেন| গত দুই-তিন দশক ধরে আমাদের দেশে একটি বস্ত্তর উচ্চফলনশীল কৃষ্টি দেখা যাচ্ছে—তার নাম কুকথা| নানা জনের কণ্ঠে নানা বাণী| বঙ্কিমচন্দ্র বেঁচে থাকলে অবশ্য লিখতেন :‘আহা কী শুনিলাম, বর্ষবর্ষান্তরেও ভুলিব না!’ নানা ভাষা, নানা মত, নানা অভিধান, কিন্তু অন্তরে অন্দরে সবার এক রা| দল ও রাজনীতি নির্বিশেষে সবাই কুকথা বলায় পারঙ্গম| মুখ খুললেই তা নির্গত হচ্ছে| স্বাদে-গন্ধে অপূর্ব! রাজনীতিবিদদের ভাষা তাদের ভাবের বাহন| আমাদের প্রিয় স্বদেশ এই গালিগালাজের স্রোতে অকাতরে গা ভাসিয়ে দিয়েছে|

বাঙালি সম্ভবত অকথা-কুকথা আর গালিগালাজকেই মহান বিপ্লব বলে ধরে নিয়েছে| সমাজ যেমন, সমাজের রাজনীতিও তেমন| সমাজ-সংস্কৃতির পরিসরেও ব্যাধির লক্ষণ স্পষ্ট| গালিগালাজই এখন ‘স্মার্ট’ হওয়ার সহজ প্রকরণ| গালাগাল শুনে হাসি| ঢলাঢলি| আহ্লাদ| সবার মধ্যেই এখন কম-বেশি অকথা-কুকথা-গালি ব্যবহারের বাতিক বাড়ছে|

আপনাকে কি অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিচ্ছে? সেই গালি কি আপনার পরিধি অতিক্রম করে মা-বাবা, পরিবার-পরিজনকেও টেনে এনেছে? বাছাই করা চার অক্ষর, পাঁচ বা ছয় সাজিয়ে রেখেছে আপনার জন্য? মনের যাবতীয় ঘৃণা, বিষ শুধু আপনার জন্য, হ্যাঁ, আপনার জন্যই উগরে দিচ্ছে? কোনো এক প্রাচীন জিঘাংসা জমতে জমতে আমার ভেতরে যে স্তূপ হয়ে ছিল, তা মুহূর্তে বের করে এনে আপনার ওপর বর্ষণ করে চলেছে? অবাক হবেন না| ভেবে নেবেন না, আপনি তার চরম ক্ষতি করেছেন| এমন শব্দবান আপনার ওপর উগরে দেওয়ার অনেক কারণ আছে| একটা হলো দৃষ্টি আকর্ষণ করা| গালাগাল না করলে এখন কেউ ফিরেও তাকায় না| ভালো কথা ভালোভাবে বললে সেটা ‘রাবিন্দ্রিক’ হিসেবে বিবেচিত হয়| সেটা উপেক্ষাযোগ্য| আরেকটা কারণ হলো, কেউ যদি আরেক জনের মতের উলটো পথে চলে কিংবা উলটো কথা বলে, তাহলে তার ‘অধিকার’ জন্মায় অপমান-অপদস্হ-আঘাত করার| কেউ কেউ অবশ্য এমনি এমনিই গালাগাল করেন| তাদের মুখে সম্ভবত ভালো কথা আসে না| এটা শুধু বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেই নয়, এটা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমবাহিত নব্য সংস্কৃতি| এই নব্য বঙ্গীয় বিপ্লব প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে, শব্দে, বাক্যে, অক্ষরে ‘প্রতিপক্ষ’ কিংবা অচেনা শত্রুর খুলি ভেদ করে চলে যাচ্ছে| আমরা ভুলে যাচ্ছি যুক্তি, প্রতিযুক্তি, তর্ক, বিতর্ক| খসে পড়ছে ‘সভ্যতা’র বর্ম| মুখোশ| এক একটি গালাগালসমৃদ্ধ পোস্টে লাইকের পর লাইক পড়ছে| কমেন্টের ঝড় উঠছে : দারুণ বলেছেন ভাই, বস ফাটিয়ে দিয়েছেন, অসাম গুরু, এ রকমই বলা উচিত ওদের, বেশ করেছেন বলেছেন...বিশ-বিশ ক্রিকেটের মতো চার-ছয়ের বন্যা বয়ে যাচ্ছে| তালি তালি তালি... যত কুকথা বলবেন, অচিরেই আপনি এই পাড়ায় জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন| আপনার খেউড় ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়বে এ-মুঠো থেকে সে-মুঠোয়| এটাই এখন সামাজিক প্রবণতা| ভালো কথার বাজারমূল্য নেই| চাহিদা নেই| তাই সরবরাহও কমে যাচ্ছে| চাহিদা না থাকলে কি আর জোগান থাকে?

ইতিবাচক ভাবনা নাই, গড়ে তুলবার মুরোদ নাই| রাজনীতির দুনিয়াই বা পিছিয়ে থাকে কেন? ছোট নেতা থেকে বড় নেত্রী, সবাই কুভাষা ধরবেন, পাড়বেন| এই সব নাকি কথামৃত| লোকায়ত ভাষা| সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক উচ্চারণ| আসলে নির্ভেজাল গরল অভব্য অশিক্ষার বিষ| অশিক্ষিতের, বস্ত্তত অশিক্ষা-গর্বিতের যুক্তির অভাব হয় না! সেই যুক্তি কুযুক্তি, অপযুক্তি| বাঙালি অপযুক্তির বশ হয়েছে|

বাঙালির মধ্যে এই গালিগালাজের সংস্কৃতি যে নতুন জন্মে হয়েছে, এমন নয়| অতীতেও সুজলা-সুফলা বঙ্গরাজনীতিতে ‘অমুক নেতার কোলে, অমুক নেত্রী দোলে’ মার্কা বহুবিধ কুবাক্যের চাষ হয়েছে| কিন্তু তা থেকে উত্তরণের পরিবর্তে সমাজ উত্তরোত্তর পঙ্কের অতলে নেমে আসার চেষ্টা করেছে| অথচ বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কদর্য ভাষা প্রয়োগের সমারোহ ছিল না| হক-ভাসানী-বঙ্গবন্ধুর বাগ্মিতা ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে| বিশেষত বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো এখনো অবাক হয়ে শুনতে হয়| যুক্তি আর আবেগের কী অপূর্ব সমন্বয় ছিল তার ভাষণে! কী অসাধারণ ছিল শব্দচয়ন!

কিন্তু এখন নোংরা অশালীন কথার জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে| যুক্তি-বুদ্ধি-শ্রদ্ধা-ভক্তির ধার না ধেরে একেকজন নেতানেত্রী স্রেফ খিস্তি-খেউড়কে মুখের ভাষা হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছেন| তাদের কথার দুর্গন্ধে পুরো দেশ ভরে যাচ্ছে| এখন নেতানেত্রীদের কথা মানেই আরেকজনকে অপমান-অপদস্হ ও হেয় করা| তাদের ভাষার কদর্যতা যেন অন্ধকারের প্রতীক ও অগ্রদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে| অপশব্দ তেজস্ক্রিয়ের মতো দূষণ সৃষ্টি করছে, আঘাত করছে| অপরকে হেয় করছে| যার আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস নাই, তিনিই অপরকে হেয় করে থাকেন| বাঙালির সব গেছে| আত্মসম্মানহারা, আত্মবিশ্বাসহারা জাতির নেতারা তাই কুকথাকেই আশ্রয় হিসেবে নিয়েছেন|

গালি আমাদের সমাজের এক মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে| গালিগালাজ করা কোনো সুস্হ মানসিকতার পরিচয় নয়| মুদ্রাদোষ বা অভ্যাসবশত অনেকেই কথায় কথায় গালি দেন, অনেকেই হাসি-তামাশা ও ঠাট্টাচ্ছলেও অন্যকে গালি দিয়ে বসেন| কী আজব ব্যাপার! গালি দিয়ে অনেকেই হিরো হতে চান| কেউ কেউ আবার মন্ত্রিত্ব হারিয়ে দেশ ছাড়েন মনের দুঃখে| কাজেই সব গালি নয় সমান| গালি থেকে সাবধান ও সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে| গালাগালমুক্ত মুখের ভাষা কি অসম্ভব?

পুনশ্চ:আমাদের দেশে কিছু আঞ্চলিক শব্দ আছে, যেগুলো গালির মতো মনে হলেও ঠিক ‘গালি’ নয়| এ ব্যাপারে একটি গল্প উল্লেখ করা যেতে পারে|

চট্টগ্রামের ব্যস্ত শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন ছাত্র| শিক্ষক তখন রুমের দিকে ফিরছেন| ছাত্রটি শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে!’

শিক্ষক মহোদয় যেতে যেতে বললেন, ‘গ্যায়া কুদ্দুস এক ক্বাম করো, তুঁই আঁর পোন্দে পোন্দে আইয়ো!’ না, শিক্ষক ভদ্রলোক কোনো অশ্লীল কথা বলেননি| তিনি ‘পোন্দে পোন্দে’ বলতে বুঝিয়েছেন ‘পেছনে পেছনে’|

উল্লেখ্য, আঞ্চলিকতা, গালি আর হিউমার কিন্তু এক নয়| এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া ভালো| পরিশেষে আঞ্চলিক ভাষা ও উচ্চারণ নিয়ে কয়েকটি প্রচলিত ‘হিউমার’ উল্লেখ করা যাক|

নোয়াখালীর এক শিক্ষার্থী লিখেছেন :‘হেলিউর ইস দ্য হিলার অব চাকসেস|’

শিক্ষক সেটা শুদ্ধ করে দিলেন :‘পেলিউর ইজ দ্য ফিলার অব ছাকচেস’|

সিলেটের মানুষ ইংরেজিতে খুব ভালো বলে নিজেদের মনে করেন| এ ব্যাপারে তারা নোয়াখালীর মানুষদের অবজ্ঞা করেন| লন্ডনে এক সিলেটি ভদ্রলোক নোয়াখালীর এক ভদ্রলোককে বলছেন, ‘দি নোয়াখাইল্লাস আর নট স্পিক ইংলিশ হরেক্টলি!’

নোয়াখালীর ভদ্রলোক দুই দিকে মাথা নেড়ে দ্বিমত পোষণ করে বললেন, ‘ন, ন, ইট ইজ বেরি হেতেটিক অ্যান্ড হিকুলিয়ার| আন্নের কতা রং!

অনেকে আছেন, নিজের ভুল বা আঞ্চলিকতা মেশানো উচ্চারণ বুঝতেই পারেন না| তারা নিজেদের ঠিক মনে করেন| একবার একজনের কথা শুনে বলেছিলাম, ‘আপনার বাড়ি কি ফেনী?’

তিনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘আন্নে কেন্নে বুইঝতাচ্ছেন আঁর বাই হেনী? আঁর কতা হুনি কেওই বুঝে না আঁর বাই হেনী|’

আমি তাকে বলেছিলাম, ‘ভাই, আন্নে এক্কেরে হাছা কইছেন, আন্নে এক্কেরে শান্িতনিকেতনী বাংলায় কতা কন!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন