মন ভালো নাই তো কিছুই ভালো নাই 

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:২১

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মন ভালো নেই’ নামের একটি অসাধারণ কবিতা রহিয়াছে, যেইখানে কবি মন খারাপের কথা এই বলিয়াছেন—‘মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই/ কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই/ চোখ খোলা তবু চোখ বুজে আছি কেউ তা দেখেনি/ প্রতিদিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়/ আশায় আশায় আশায় আশায়।’ 

মন ভালো হইয়া যাইবে—প্রতিটি দিন ‘আশায় আশায়’ দিন কাটিবার কথা এইখানে বারবার বলা হইয়াছে।

‘আশা’ তো থাকিতেই হইবে, তাহার সহিত থাকিতে হইবে মন ভালো করিবার সত্যিকারের চেষ্টা, কিছু কার্যকর পদক্ষেপ। গত সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ উদ্যোগ’ শীর্ষক একটি সভা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি যৌথভাবে আয়োজন করে।

সেইখানে বলা হইয়াছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত হইলেও খুব কম মানুষ চিকিত্সকের দ্বারস্হ হয়। সর্বশেষ জরিপ বলিতেছে, মানসিক রোগে আক্রান্ত ৯২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো চিকিৎসা গ্রহণ করেন না। অন্যদিকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে চিকিত্সা না লইবার হার ৯৪ শতাংশ। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিত্সা না লইবার প্রধান কারণ দুইটি। উহার একটি হইল—মানসিক স্বাস্হ্যসমস্যা লইয়া মানুষের সচেতনতার ঘাটতি রহিয়াছে। অন্য কারণটি হইল—লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে সমস্যা থাকিলেও নিজে বা নিকটজনকে চিকিত্সকের নিকট লইতে চাহেন না।

শুধু বাংলাদেশে নহে, সারা বিশ্বেরই বিশাল জনগোষ্ঠী মানসিক রোগে ভুগিতেছে। নানা কুসংস্কার আর অসচেতনতার কারণে তাহা গোপন করা হয়। ফলে এই রোগীরা চিকিত্সাসেবা হইতে বঞ্চিত হইতেছে। নীরবে দুর্বিষহ জীবন যাপন করিতেছে তাহারা। মনে রাখিতে হইবে, মানবসভ্যতার শুরু হইতেই মানুষের তৈরি অসমতা ছিল। তাহা উন্নয়নশীল বিশ্বে আরো বেশি প্রকট হইতেছে। নগরায়ণের ফলে আমরা নিজেদের অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিয়াছি। আর যুদ্ধবিগ্রহ মানবসভ্যতার নিত্যচর্চার বিষয়। 

কর্মক্ষেত্রেও মানুষ নানানভাবে চাপে থাকেন। গৃহবিবাদও বাড়িতেছে দিন দিন। সুতরাং মানুষ ঘরে-বাহিরে ভালো নাই।

এই অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাইমারি, সেকেন্ডারি, টারশিয়ারি—সব ধরনের মানসিক সেবা লইবার কোনো বিকল্প নাই। তবে দুঃখজনকভাবে ইতিপূর্বে দেখা গিয়াছে যে, সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে অন্তত ৪ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় আছেন বা মানসিক রোগে আক্রান্ত।

অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে আমাদের চিকিত্সাসেবা দিতে পারেন, এমন মানুষের সংখ্যা মাত্র ১ হাজার! অর্থাত্, আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্হ্যসেবাপ্রত্যাশী ৩ লক্ষ মানুষের বিপরীতে মাত্র এক জন মানসিক চিকিত্সক রহিয়াছেন। এমনিতেই কোভিড মহামারিকালে সারা বিশ্বেই মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাইতেছে। 

স্বাভাবিকভাবেই মহামারিকালের বিধিনিষেধে মানসিক স্বাস্থ্য যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি গুরুত্ব পাইয়াছে।

পাশাপাশি চিকিত্সাপদ্ধতিও উল্লেখ করিবার মতো উন্নত হইয়াছে। তবে দুঃখজনকভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের মাত্র ০.৫ শতাংশ ব্যয় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ব্যয় করা হয়। বাংলাদেশে সরকারি মেডিক্যালের সংখ্যা ৩৬। ইহার মধ্যে ১৬টিতেই কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিভাগ নাই। 

স্পষ্টতই এই বিষয়টি না পড়িয়াই এমমিবিএস শেষ করিয়া চিকিত্সক হইয়া যাইতেছেন ঐসকল মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা।

মানসিক সমস্যাকে আমরা অবহেলা করিলেও সম্প্রতি একটি গবেষণায় বলা হইয়াছে, ২০৩০ সালে বিষণ্নতা মানুষের উত্পাদনমুখিতার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় বাধা হইয়া দাঁড়াইবে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা।

আসলে মন ভালো নাই তো কিছুই ভালো নাই। মানুষ তো বাঁচে মানসিকভাবে। সুতরাং আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিদ্যমান সমস্ত সমস্যার সমাধানে আমাদের যাহা করণীয়, তাহা করিতেই হইবে।

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন