পরিবেশ দূষণ বর্তমান বিশ্বের একটি ভয়াবহ সমস্যা। প্লাস্টিক দূষণের কারণে মানুষের পাশাপাশি সামুদ্রিক ও বন্যপ্রাণীর বাস্তুতন্ত্রেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। নিয়মিত প্লাস্টিক পদার্থের ব্যবহার এবং প্লাস্টিক দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীলতা প্লাস্টিক দূষণের মাত্রাকে বহুগুণে ত্বরান্বিত করছে।
প্লাস্টিক দূষণের জন্য মূলত দুই ধরনের প্লাস্টিক দায়ী; মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ম্যাক্রোপ্লাস্টিক। প্লাস্টিক বর্জ্য উত্পত্তিস্হল থেকে বিভিন্ন উপায়ে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং অপচনশীল বৈশিষ্টে্যর কারণে পুনঃচক্রায়ন না হওয়া পর্যন্ত এটি পরিবেশে অবস্হান করে এবং প্রাণীর খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে। এছাড়াও প্লাস্টিকে বিদ্যমান বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ভূগর্ভস্হ পানি ও ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে মিশে উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। গবেষণায় জানা যায় যে, জীবাণুবিয়োজ্য প্লাস্টিক ভাঙনের মাধ্যমে মিথেন গ্যাস উত্পন্ন হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে উনিশ শতকে পলিথিন ও প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যের প্রচলন মানবজীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। বর্তমানে আমাদের নিত্যব্যবহার্য সরঞ্জামের বেশির ভাগই প্লাস্টিক। ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, গৃহস্হালীর আসবাবপত্র, খাদ্যদ্রব্য বিপণন থেকে শুরু করে সর্বত্রই প্লাস্টিকের উপস্হিতি লক্ষণীয়। দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্লাস্টিকের বেশির ভাগই মাত্র একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। ফেলে দেওয়া এসব প্লাস্টিকের সর্বশেষ গন্তব্য হয় নর্দমা,পুকুর, ড্রেন, নদী কিংবা সমুদ্র। এর ফলে পানি দূষণ ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। নিঃসন্দেহে এটি জলজ প্রাণী ও সামুদ্রিক বাস্ত্ততন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত। এছাড়াও সামুদ্রিক পাখি ও অন্যান্য প্রাণীরা খাদ্য হিসেবে প্লাস্টিক বর্জ্য গ্রহণ করার ফলে প্লাস্টিকে বিদ্যমান রাসায়নিক উপাদান তাদের দেহের টিসু্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বিনষ্ট করে অবশেষে মৃতু্য ঘটায়। এছাড়াও প্লাস্টিক পদার্থে ব্যবহূত রাসায়নিক রঞ্জক কারসিনোজেন হিসেবে মানবদেহের এন্ডোক্রাইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমাদের নিত্যব্যবহার্য প্লাস্টিক সামগ্রী সূর্যালোকের সংস্পর্শে এসে বিষাক্ত রাসায়নিক উপকরণ তৈরি করে, যা ব্রেস্ট ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধি, গর্ভধারণে সমস্যা, লিভার ক্যানসারসহ নানা ধরনের জটিল রোগের সৃষ্টি করে। সারা বিশ্বে ব্যবহূত প্লাস্টিকের প্রায় ৫০ শতাংশই উত্পন্ন হয় এশিয়া মহাদেশে।
সম্প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের ব্যবহূত প্লাস্টিকের ৩০ শতাংশ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়াও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব যেহেতু এক বিরাট বড় জলবায়ু সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেহেতু দূষণ নিয়ন্ত্রণে এখনো যদি আমাদের বোধোদয় না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ পরিণতির নীরব সাক্ষী হতে হবে সমগ্র বিশ্ববাসীকে। আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্লাস্টিক ব্যবহার সীমিত করতে হবে, পাট ও পাটজাত পণ্য ব্যবহারের পাশাপাশি হারানো পাটশিল্পকে জাতীয়করণ করতে হবে, প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে হবে, পাটজাত দ্রব্য ব্যবহারকে উত্সাহিত করার জন্য সরকারিভাবে ভোক্তা ও উদ্যোক্তাদের পুরস্কৃত করতে হবে, যে কেউ যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেললে তার জন্য শাস্তির ব্যবস্হা গ্রহণ করতে হবে, প্লাস্টিক দ্রব্যের ওপর অত্যধিক শুল্ক আরোপ করে পাটজাত দ্রব্যের সুলভ মূল্য নিশ্চিত করতে হবে, প্লাস্টিক পুনঃপ্রস্ত্ততির ব্যবস্হা গ্রহণ, প্লাস্টিক পণ্যের বিকল্পরূপে বায়োডিগ্রেডেবল পদার্থ ব্যবহারে উত্সাহিতকরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্হাসমূহকে প্লাস্টিক দূষণের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের অস্তিত্বের হুমকি হচ্ছে প্লাস্টিক। যে কোনো সমস্যা সমাধানে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়া সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। নদীমাতৃক এই দেশের প্রাণপ্রবাহ বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণে বিপন্ন প্রাণীকুলকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। সর্বোপরি এই পৃথিবীকে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত ও বাসযোগ্য রাখতে হলে সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
লেখক :শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
