সুভাষচন্দ্র বসুর ‘আজাদ হিন্দ রেডিও’ 

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:৪২

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ভারতবর্ষের ইতিহাস চিহ্নিত করেছে সেনানায়ক, রাজনীতিবিদ, দেশপ্রেমিক হিসেবে। এ তার খণ্ডিত পরিচয় মাত্র। ভারতবর্ষের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তত্কালীন অনেক জাতীয় নেতার নাম লিপিবদ্ধ করা হলেও লেখক, সাংবাদিক, সম্পাদক ও সংবাদপত্র পরিচালক হিসেবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র প্রায় অনুল্লেখ্য থেকে গেছেন। রাজনৈতিক নানা কর্মসূচির ক্লান্ত অবসন্ন দেহে পত্রিকায় অগ্নিময় লেখা লিখেছেন, লিখেছেন সম্পাদকীয়, চিন্তাভাবনা করেছেন পত্রিকার প্রচার ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য। 

রাজপথে ব্রিটিশ পুলিশের অত্যাচারে রক্তাক্ত হয়ে ১১ বার কারারুদ্ধ হয়েছেন সুভাষচন্দ্র। জেলের মধ্যেও নির্যাতিত হয়েছেন নির্মমভাবে। তবু তাঁর কলম থেমে থাকেনি। শুধু তার পরিচালিত কিংবা সম্পাদিত পত্রপত্রিকা নয়, ব্রিটিশবিরোধী জনমত সৃষ্টিতে সমসাময়িক বহু পত্রপত্রিকায় তার জাতীয়তাবাদী ও সাম্রারাজ্যবাদবিরোধী লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। দেশের বহু বিখ্যাত তরুণ লেখক ও প্রতিভাশালী ব্যক্তিদের নিয়ে এক লেখকগোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন তিনি।

তার সম্পাদিত রাজনৈতিক মুখপত্র ইংরেজি সাপ্তাহিক ফরোয়ার্ড-ব্লক ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের মাথাব্যথার কারণ ছিল, তার প্রমাণ রয়েছে মহাফেজখানার নানা নথিপত্রে। বিশ্বস্তরে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত সংগঠিত করতে নেতাজি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আজাদ হিন্দ রেডিও। এই প্রতিষ্ঠানের শাখা ছিল বিশ্বের ছয়টি দেশে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিশৃঙ্খল ও উত্তাল প্রেক্ষাপটে যা প্রায় অবিশ্বাস্য। গণমাধ্যম জগতে নেতাজির প্রতিভার বিকাশ ঘটল সুদূর জার্মানিতে। এলগিনের বাড়ি থেকে ছদ্মবেশে পালিয়ে নানা দেশ ঘুরে ১৯৪২ সালে তিনি উপস্হিত হলেন হিটলারের জার্মানিতে। তত্কালীন জার্মান সরকারের সহায়তায় বার্লিনে প্রতিষ্ঠিত হলো আজাদ হিন্দ রেডিও। পরবর্তী সময়ে এই সংস্হার সদর দপ্তর স্হানাস্তরিত হয়েছিল সিঙ্গাপুরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে এই সদর দপ্তর আবার সরিয়ে নেওয়া হলো নিরাপদ শহর রেঙ্গুনে।

আজাদ হিন্দ রেডিও ইংরেজি ছাড়া ভারতীয় ভাষায় অনুষ্ঠান এমনকি হিন্দি, তামিল, বাংলা, মারাঠি, পাঞ্জাবি,পুস্ত ও উর্দু—এই সাত ভাষায় সংবাদ প্রচার করত। কেননা, তত্কালীন ভারতবর্ষে এই ভাষাগুলো সর্বাধিকসংখ্যক মানুষ ব্যবহার করত। এছাড়া স্হানীয় অধিবাসীদের জন্য জার্মান ভাষায়ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হতো। আজাদ হিন্দ রেডিওতে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা ও বক্তব্য দেওয়ার জন্য নেতাজি মাত্র তিন মাসের চেষ্টায় জার্মান ভাষা শিখেছিলেন। তিনি ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা, জার্মান ও রুশ ভাষায় স্বদেশবাসী ও বিশ্ববাসীর উদ্দেশে তার ও আজাদ হিন্দ সরকারের লক্ষ্য ও কর্মসূচি ব্যাখ্যা করতেন। নেতাজির অনুরাগীদের পাশাপাশি সম্প্রচারের ওপর নিয়মিত নজর রাখতেন ব্রিটিশ, মার্কিন ও মিত্র শক্তির গুপ্তচরেরা।

বার্লিন ও সিঙ্গাপুরের পর আজাদ হিন্দ রেডিও সদর দপ্তর ছিল টোকিওতে। এই রেডিও স্টেশন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন বঙ্গতনয়া হরিপ্রভা মল্লিককে। হরিপ্রভা ১৮৯০ খ্িরষ্টাব্দে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে ১৯১২ খ্িরষ্টাব্দে জাপানে স্হায়ীভাবে বসবাস করেন। ১৯১৫ খ্িরষ্টাব্দে তিনি আত্মজীবনীমূলক গ্রম্হ বঙ্গমহিলার জাপানযাত্রা রচনা করেন। এই বই নেতাজির নজরে আসে এবং তিনি স্বয়ং হরিপ্রভার সঙ্গে যোগাযোগ করে আজাদ হিন্দ সরকার তথা দেশের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার আবেদন করেন। নেতাজির ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৪১ সালে হরিপ্রভা আজাদ হিন্দ রেডিও নিপ্পন শাখার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও আত্মবিস্মৃত বাঙালি এই মহিলার নাম প্রায় ভুলতে বসেছে।

আজাদ হিন্দ রেডিওর সিঙ্গাপুর শাখা থেকে ১৯৪৪ সালের ৫ জুলাই ভাষণে নেতাজি প্রথম মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীকে জাতির জনক আখ্যায় ভূষিত করেন। পরে এই নামে গান্ধীজি সমগ্র দেশবাসীর কাছে পরিচিত হন। আজাদ হিন্দ রেডিও কোনো রকম ভতু‌র্কি বা কারো অনুদানের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে লভ্যাংশের কিছুটা আজাদ হিন্দ সরকারকে দান করত। রেডিওটির কোনো না কোনো শাখা থেকে নেতাজির মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর ভেসে আসত, তার জন্য ভারতবর্ষের নগরে-প্রান্তরে লাখ লাখ মানুষ অপেক্ষা করতেন। বেতারে ভেসে আসা নেজাজির কণ্ঠে ধ্বনিত ‘জয় হিন্দ’ ও ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে কণ্ঠ মেলাতেন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তরে অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষ।

আজাদ হিন্দ রেডিও কার্যক্রম শুরু করে ২ নভেম্বর ১৯৪১ সালে। ঐ দিনই বার্লিনে অনুষ্ঠিত এক মিটিংয়ে নেতাজি প্রস্তাব করেন, ‘জনগণমন’ হবে স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীত। সেদিন আরো কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। যেমন—‘হিন্দুম্হানি’ (হিন্দি) হবে ভারতের জাতীয় ভাষা, ‘জয় হিন্দ’ হবে ভারতের জাতীয় সম্ভাষণ এবং সুভাষচন্দ্র পরিচিত হবেন ফুয়েরার নামে। এই জার্মান ফুয়েরায় শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হলো নেতাজি। প্রতিটি তথ্যই প্রথম মানুষ জানত আজাদ হিন্দ রেডিওর সম্প্রচারে।

প্রতিষ্ঠার সময় আজাদ হিন্দ রেডিও পরিচালিত হতো বিশেষ বু্যরোর অধীনে। এই বু্যরোর প্রধান ছিলেন অ্যাডাম-ভন-ট্রো নামে জার্মান কূটনীতিবিদ। জার্মানিতে গিয়ে দায়িত্ব নিলেন সুভাষচন্দ্র। ১৯ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে নেতাজি স্বয়ং আজাদ হিন্দ রেডিও ম্যানিফেস্টো পাঠ করে শোনান। এর সঙ্গে তিনি মেশাতে চেয়েছিলেন জাতীয়তাবোধ ও শৃঙ্খলপরায়ণতা; গান্ধীজির মানবতাবাদ। এসব ভাবনার স্বকীয় সংশ্লেষণের মধ্যে তিনি চেয়েছিলেন নতুন রাষ্ট্র দর্শনের প্রতিষ্ঠা। ভারতীয় মতে, ভারতীয় পথে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতাজির ভাবনা-স্বপ্ন-পরিকল্পনা মানুষের কাছে পৌঁছার হাতিয়ার হিসেবে তিনি বেছে নিলেন তত্কালীন সময়ে সর্বাধিক জনপ্রিয় গণমাধ্যম বেতারকে। ভারত ইতিহাসের স্বর্ণালি অধ্যায় প্রায় সবটাই হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অন্তরালে। আজাদ হিন্দ রেডিও ছিল ভারতীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বৈদু্যতিক গণমাধ্যমগুলোর পথিকৃত্। বিভিন্ন প্রকাশনার মধ্য দিয়ে এক সর্বকালীন গণনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দুরন্ত সাংবাদিক হূদয়ের সন্ধান পাওয়া যায়।

ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বাংলাদেশ সফরকালে উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ব্যবহূত একটি টি-৫৫ ট্যাঙ্ক ও একটি মিগ-২৯ যুদ্ধ বিমান। এই ট্যাঙ্ক ও যুদ্ধবিমান প্রদর্শনীর জন্য সামরিক জাদুঘরে রাখা হবে, যা দেখে দেশের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা আরো বিশদভাবে জানতে পারবে।

বাংলাদেশ-ভারত দুটি দেশ প্রতিবেশি ও অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলাদেশ-ভারত শুধু সীমান্ত সম্পর্কেই আবদ্ধ নয়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দুই দেশের জনগণের রক্তস্রোতই সুসম্পর্কের ভিত্তি রচনা করে। দুই দেশের অভিন্ন মূল্যবোধ, পারস্পরিক আস্হা ও শ্রদ্ধা এবং সমঝোতার ভিত্তিতে রচিত বন্ধুত্ব ও সৌহার্দে্যর সম্পর্ক।পরবর্তী সময়ে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো সৃদৃঢ় ও গতিশীল হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের বিজয় দিবসের সমাপনী অনুষ্ঠানে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দর বাংলাদেশ সফর।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা

ইত্তেফাক/এএইচপি