ভাসানচরের পথে উখিয়া ছাড়লো ৫৫০ রোহিঙ্গা

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:০৭

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ আশ্রয় কেন্দ্র থেকে অষ্টম দফায় ভাসানচরের উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করেছেন সাড়ে ৫শ' রোহিঙ্গা। শুক্রবার (১৭ ডিসেম্বর) বেলা ১টার দিকে ৯টি বাসে ৩৮৯ জন এবং বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ১৪৮ জন রোহিঙ্গা নিয়ে ৬টি বাস উখিয়া ডিগ্রি কলেজের মাঠ থেকে চট্টগ্রামের নেভাল ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। খালি বাস, মালামাল নিয়ে একাধিক কাভার্ডভ্যান ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিরাপত্তা দলের বহর সন্ধ্যা পর্যন্ত চট্টগ্রামের পথেই ছিলো। এর আগে, গত ২৪ নভেম্বর (বুধবার) সপ্তম দফায় ৩৭৯ জন রোহিঙ্গা উখিয়া ত্যাগ করার পর ২৫ নভেম্বর ভাসানচর পৌছায়।

গত এপ্রিলে বর্ষায় যাত্রা স্থগিত করার পর ইউএনএইচসিআর ও সরকারের মাঝে ভাসানচরে শরণার্থী ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হওয়ার পর ২৪ নভেম্বর প্রথমবার এবং ১৭ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার রোহিঙ্গারা কক্সবাজার ছাড়লো।

সূত্র জানায়, ভাসানচরে যাবার উদ্দেশ্যে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে সপরিবারে উখিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে আসতে থাকে রোহিঙ্গারা। শুক্রবার সকালেও আসে অনেকে। সকল প্রক্রিয়া শেষ করে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বাসে ওঠা শুরু করে রোহিঙ্গারা। এরপর ১টার দিকে ভাসানচরের উদ্দেশ্যে প্রথম বহর চট্টগ্রামের পথে রওনা দেয়া হয়। আর দ্বিতীয় বহর যাত্রা করে বিকাল ৪টায়। পূর্বের নিয়মে রাতে চট্টগ্রামের বিএন শাহীন কলেজের ট্রানিজট ক্যাম্পে অবস্থান করবেন তারা। সেখান থেকে শনিবার (১৮ ডিসেম্বর) নৌবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় ভাসানচরে যাবার প্রস্তুতি রয়েছে।

কক্সবাজার ত্রাণ ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত জানান, সরকারের সিদ্ধান্তে উখিয়া-টেকনাফ ক্যাম্প থেকে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা ভাসানচর স্থানান্তর হবে। কাউকে জোর করে নয়, সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানানোর পর যারা স্বেচ্ছায় যেতে রাজি হচ্ছেন তাদের জড়ো করে নির্ধারিত একটি দিনে পৌছে দেয়া হচ্ছে। লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ যাত্রা চলমান থাকবে। অষ্টম দফায় ৫ শতাধিক রোহিঙ্গা ভাসানচর যাবার পথে রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে তোলার পর সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝিদের মতে, ভাসানচর যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গারা স্ব-স্ব ক্যাম্প ইনচার্জ কার্যালয়ে নাম জমা দেন। ভাসানচরের পরিবেশ, থাকা খাওয়ার সুবিধা সম্পর্কে ব্রিফিং করার পর যারা যেতে রাজি হচ্ছে তাদের নিবন্ধনের মাধ্যমে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

তাদের মতে, বাস্তুহারা রোহিঙ্গারা দোলাচলে ভোগে। এটা আমাদের আশ্রয়ের জীবন। যেখানেই থাকি সেটা মানবিক সহায়তা। কিন্তু ভাসানচরে বন্দি জীবন মনে করে অনেকে যেতে চান না। কিন্তু সম্প্রতি ভাসানচরের রোহিঙ্গারা চাইলে উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পে থাকা স্বজনদের দেখতে আসতে পারবে, সরকারের এ ঘোষণার পর ভাসানচর মুখী মানুষের সংখ্যা আবার বাড়ছে।

কক্সবাজার-১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) নাইমুল হক নাইম জানান, দুভাবে বিভক্ত হয়ে রোহিঙ্গাদের আরো একটি দল শুক্রবার ভাসানচরের উদ্দেশ্যে উখিয়া ত্যাগ করেছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি সময় পর্যন্ত আট দফায় প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা ভাসানচরের অধিবাসী হয়েছে। এরা ছাড়াও গত বছরের মে মাসে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাবার চেষ্টাকালে ৩০৬ রোহিঙ্গাকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে সেখানে নিয়ে রাখা হয়।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নিপীড়নের মুখে দেশটি থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আগের ও তখনকার মিলিয়ে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে বসবাস করছে। ওই বছরের নভেম্বরে কক্সবাজার থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প নেয় সরকার। আশ্রয়ণ-৩ নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গা স্থানান্তরের জন্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ১৩ হাজার একর আয়তনের ওই চরে এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাসের উপযোগী ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ভাসানচরের পুরো আবাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

ঘর তৈরীর পর গত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কয়েক দফায় স্বেচ্ছাগামী প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা সেখানে পৌঁছলে তাদেরকে দালানের একেকটি ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেয়া হয়। রোজার পর সেখানে অবস্থানকারীদের জন্য উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদের জামায়াত ও আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান। কিন্তু যাযাবরের জীবন অতিবাহিত করা রোহিঙ্গাদের অনেকে ভাসানচরের জীবন ফেলে সেখান থেকেও পালাতে শুরু করে। রাতের আঁধারে ছোট নৌকায় নদী পার হতে গিয়ে ডুবে মরার ঘটনাও আছে। অপরাধের সাথে বাস বা বাউন্ডেলে জীবন পছন্দ করা রোহিঙ্গারা একে 'বন্দিজীবন' বলে অভিহিত করছে।

ইত্তেফাক/এসএ