খুলনায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ তুঙ্গে

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২১, ০৫:২০

খুলনায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন তুঙ্গে। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন নেতাকর্মীরা। মহান বিজয় দিবসেও দুটি পক্ষ নগরীতে পৃথকভাবে মিছিল করেছে। এটিকে দুই পক্ষের শোডাউন হিসেবে দেখছে অনেকে।

অন্যদিকে নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর দীর্ঘদিন ধরে ‘নিষ্ক্রিয়’ থাকা অনেক নেতাকর্মী আবারও ‘সক্রিয়’ হয়ে উঠেছেন।

গত ৯ ডিসেম্বর কেন্দ্র থেকে হঠাত্ করে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙে দিয়ে আংশিক আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এর আগে খুলনায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে কানাঘুষা থাকলেও নতুন কমিটি ঘোষণার পর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। 

এরপর পদ-পদবিধারী নেতাকর্মীরাও কার্যত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। মহানগরীর থানা কমিটিগুলোর অধিকাংশ নেতা সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সঙ্গে থাকায় ঐ কমিটিগুলো শিগগিরই ভেঙে দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার দুই দিন পর ১২ ডিসেম্বর সাবেক মহানগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু তার সমর্থকদের নিয়ে বিএনপি খুলনার ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন করেন, যা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা তার ওপর নাখোশ হন। সংবাদ সম্মেলনের কয়েকটি বক্তব্যের জন্য তাকে শোকজ করা হয়। ঐ দিন দলের অপর গ্রুপ দলীয় কার্যালয়ে পালটা সমাবেশ করে।

নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির এক নেতা দলের বিভক্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গত দেড় দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় খুলনা বিএনপির রাজনীতির হাল ধরে রেখেছেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। মঞ্জুকে পূর্বের পদ ফিরিয়ে না দিলে আমার মতো অনেকেই বিএনপির রাজনীতি ছেড়ে দেবেন।’

২৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আরেক নেতা বলেন, বর্তমান কমিটিতে যাদের স্থান দেওয়া হয়েছে, তাদের দিয়ে দুঃসময়ে মাঠের রাজনীতি করা সম্ভব নয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের মধ্যে ভেদাভেদ দূর করে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার জন্য তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানান। 

তবে সদ্য সাবেক মহানগর কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এহতেশামুল হক শাওন বলেন, ‘দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সারা দেশে নগর ও জেলা কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যাদের নেতৃত্বে আন্দোলনের সফলতা আসবে, তাদেরই নির্বাচিত করা হবে। নজরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরোধিতার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। তিনি যেটা করছেন তা যুক্তিহীন এবং দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থি। বিএনপি কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না, তা বিজয় দিবসের শোভাযাত্রা প্রমাণ করেছে।’ 

মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, নতুন কমিটি ঘোষণার পর নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর বাড়িতে গিয়েছেন। বিজয় দিবসের আলোচনা ও শোভাযাত্রার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তার পরও তিনি দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেননি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। তিনি যে নির্দেশনা দেবেন, সেটি অনুসরণ করে কাজ করা হবে। 

মহানগর কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম জহির বলেন, নতুন কমিটি ঘোষণার পর দলের তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী সক্রিয় হয়েছেন। তবে নেতারা আগেও সক্রিয় ছিলেন, এখনো আছেন। কিন্তু সেইভাবে পদ-পদবি না থাকায় এত দিন অনেককেই সামনের সারিতে দেখা যেত না। 

ভেঙে দেওয়া হতে পারে থানা কমিটি 

আগামী ১৫ দিনের মধ্যে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির ৫১ সদস্য করে দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হবে। এছাড়া দলের কর্মসূচিতে ‘সক্রিয় না হলে’ ভেঙে দেওয়া হতে পারে থানা কমিটিও। 

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির হাইকমান্ডের আমন্ত্রণে গতকাল শনিবার খুলনা মহানগর ও জেলা কমিটির ছয় নেতা ঢাকায় গেছেন। প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিত্সার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার পরামর্শ দিতেই মূলত নেতাদের ঢাকায় ডাকা হয়েছে। 

এর আগে ১৫ ডিসেম্বর দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী টেলিফোনে হাইকমান্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে স্থানীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানান। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এস এম শফিকুল আলম মনা জানান, হাইকমান্ডের পরামর্শ পাওয়ার পর থানা কমিটিগুলো কর্মসূচিতে অংশ না নিলে এসব কমিটি বাতিল হবে। সেখানে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। কেন্দ্রীয় চিঠির আলোকে তিনি বলেন, ১৫ দিনের মধ্যে মহানগর ও জেলা শাখায় ৫১ সদস্য করে দুটি কমিটি গঠন করা হবে। যশোরের সমাবেশে দলের স্থানীয় পর্যায়ের সবচেয়ে বেশি নেতাকর্মী পাঠানো হবে। 

উল্লেখ্য, গত ৯ ডিসেম্বর দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙে দিয়ে আংশিক আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। কেন্দ্র ঘোষিত মহানগর কমিটির আহ্বায়ক করা হয় সাবেক জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা, যুগ্ম-আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম জহির ও সদস্যসচিব শফিকুল আলম তুহিনকে। অন্যদিকে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়েছে সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান, যুগ্ম-আহ্বায়ক আবু হোসেন বাবু ও সদস্যসচিব মনিরুল হাসান বাপ্পীকে। 

ইত্তেফাক/এএএম