আর কত বেপরোয়া হইবে কিশোর গ্যাং?

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১৫:৩৩

দিন যতই যাইতেছে, কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধগুলি ক্রমেই হিংস্র, নৃশংস ও বিভীষিকাপূর্ণরূপে দেখা দিতেছে। দেশ জুড়িয়া নগরকেন্দ্রিক কিশোর গ্যাং কালচার ভয়ংকর রূপ ধারণ করিয়াছে। তবে কেবল শহর কিংবা নগরেই নহে, জেলা-উপজেলা এবং গ্রামেও ছড়াইয়া পড়িতেছে ভয়াবহ কিশোর গ্যাং কালচার। মাদক সেবন ও বিক্রি, চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাই, নারীদের উত্ত্যক্ত করা হইতে শুরু করিয়া ধর্ষণ এমনকি হত্যাকন্ডের ন্যায় জঘন্য অপরাধও ঘটাইতেছে এইসব কিশোরেরা। এতোদিন আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করিয়া কিশোর গ্যাংদের এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হইয়া নিজেদের মধ্যে খুন খারাবিতে লিপ্ত থাকিলেও এখন পেশাদার কিলার গ্রুপের ন্যায় ভাড়ায় খুন করিতে শুরু করিয়াছে। অপ্রতিরোধ্য এবং বেপরোয়া এই সকল কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকান্ড সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য নিঃসন্দেহে অশনিসংকেত।

সাধারণত কিশোর বয়সিদের দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডকে কিশোর অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে ১৮ বত্সরের নিচে কেহ অপরাধের সহিত জড়িত থাকিলে তাহাদের কিশোর অপরাধী হিসাবে বিবেচিত করা হইয়া থাকে। কিশোর কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা সাধারণত আবেগপ্রবণ হইয়া থাকে। তাহাদের মধ্যে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এই বয়সে কিশোর-কিশোরীরা ভালো-মন্দের বিচার-বিবেচনা করিতে পারে না, নিজেদের সিদ্ধান্তগুলিকেই তাহারা সঠিক ভাবিয়া লয়। কোনো কারণে সেই সিদ্ধান্তগ্রহণকেন্দ্রিক আশা ভঙ্গের ঘটনা ঘটিলে তাহারা হতাশাগ্রস্ত হইয়া বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়াইয়া পড়ে। ইহার পাশাপাশি সমাজব্যবস্হা, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহচর্য, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রের নানাবিধ উপকরণ কিশোর অপরাধী তৈরির উপাদান হিসাবে কাজ করিয়া থাকে। সমাজে বিদ্যমান নানা অসংগতি, দারিদ্র, ধনী-গরিব বৈষম্য, হতাশা, অস্হিতিশীলতা, সম্প্রীতির অভাব ইত্যাদি কারণেও কিশোররা অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হইয়া পড়ে। বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাং এর লালন-পালন ও প্রশ্রয় দিয়া থাকে রাজনৈতিক গডফাদারেরা। এই সকল কিশোর গ্যাং সদস্যদের যে ধরণের অপরাধ করিবার নির্দেশ দিয়া থাকে তাহারা, ঠিক সেই রকম অপরাধই ঘটাইয়া থাকে কিশোররা। পত্র-পত্রিকা, মিডিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র হইতে জানা গিয়াছে, পর্দার আড়ালে থাকিয়া রাজনৈতিক পরিচয়ধারী গডফাদাররা নিজেদের স্বার্থে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর গ্যাং দিয়া এলাকায় মাস্তানি চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি খুনোখুনির ঘটনাও ঘটাইতেছে। কিশোর বয়স হইতে গ্যাং কালচারে জড়িত থাকিয়া তাহারা এক পর্যায়ে নিজেরাই মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী হইয়া উঠে এবং তথাকথিত রাজনৈতিক গডফাদারদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়। আবার অনেক কিশোর গ্যাং সদস্য উচ্চাভিলাষী হইয়া এলাকায় নিজেকে ‘ডন’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করিতে ভাড়ায় খুন খারাবিও পর্যন্ত করিতেছে। কিশোরদের যেই বয়সে বইখাতা, স্কুলব্যাগ লইয়া ব্যস্ত থাকিবার কথা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মাকান্ডে নিয়োজিত থাকিয়া নিজেদের বিকশিত করিবার কথা, সেই বয়সে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত করিয়া তাহারা ভবিষ্যত্ সম্ভবনাকে নষ্ট করিয়া দেয়।

বাংলাদেশের আইনে ১৮ বত্সর বয়স পর্যন্ত কেহ অপরাধ সংঘটিত করিলে দন্ডবিধিতে কোনো বিচারকার্য সম্পাদন করা যায় না, তাহাদের আটক করিয়া সংশোধন কেন্দ্রে পাঠাইতে হয়। আমাদের দেশে পর্যাপ্ত কিশোর সংশোধন কেন্দ্রের অভাব রহিয়াছে, গাজীপুরে দুইটি এবং যশোরে একটি শিশু কিশোর সংশোধন কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতূল। ইহার ফলে আটক কিশোর অপরাধীদের একটি বড় অংশকে উন্নয়ন কেন্দ্রে স্হান সংকুলানের অভাবে কারাগারেই রাখিতে হয়। জামিনে মুক্ত হইয়া তাহারা আবার অপরাধ কর্মকান্ডে যুক্ত হয়। বস্ত্তত, পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ইতিবাচক উদ্যোগ এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনি ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমেই কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানিয়া ধরিতে হইবে। কিশোরদের মানসিক বিকাশ ও সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের জন্য গঠনমূলক পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে। সকলের সমন্বিত ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং কালচার নির্মূল করিয়া শিশু-কিশোরদের সুনাগরিক এবং ভবিষ্যত্ সম্পদ হিসাবে গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন