সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে চলেছে| অর্থনৈতিক সাফল্যের স্বীকৃতি এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্হা ও ফোরামের নিকট থেকে| বিশ্বব্যাংকের রেটিং অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০১৫ সালে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে| জাতিসঙ্ঘের সহযোগী সংস্হা কতৃর্ক বাংলাদেশ ‘উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হবার জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে| সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সাল থেকে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে| বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এসব অর্জন কোনোভাবে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করা যাবে না| বাংলাদেশ নিজেও রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু অর্জনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ| বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে কার্যকর উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়| একইভাবে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ|
বাংলাদেশ যদি ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে, সেটা হবে একটি বিস্ময়কর ঘটনা| কারণ এর আগে পৃথিবীর কোনো দেশই এত অল্প সময়ে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে পারেনি| নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবার পর চীন সবচেয়ে কম সময়ে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে ওঠে এসেছিল| এজন্য দেশটির সময় লেগেছিল ১৭ বছর| আর বাংলাদেশ যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তাতে আমরা চীনের চেয়ে এক বছর আগেই উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চাই| চীন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবার পরবর্তী ১৭ বছর প্রতি বছর গড়ে ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে| কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সিঙ্গেল ডিজিট প্রবৃদ্ধির ঘরে পড়ে আছে| আমরা যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চাই, তাহলে অবশ্যই প্রবৃদ্ধির গতি আরো বাড়াতে হবে| বিষয়টি নিয়ে আলাপ হয় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরীর সঙ্গে| তিনি বলেন, ‘গত ৫০ বছরে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অর্জন তা অনেকটাই বিস্ময়কর| আধুনিক বিশ্বে বাংলাদেশকে উন্নয়নের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে| স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশ উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে| পৃথিবীতে যে ৫/৬টি দেশ সবচেয়ে দ্রুত গতিতে উন্নয়ন সাধন করছে বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম| গত ৫০ বছরে আমাদের প্রবৃদ্ধির যে ইতিহাস তা যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখব, স্বাধীনতার পর বিশেষ করে ’৭০-এর দশকে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার খুব একটা বেশি ছিল না| সেই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পক্ষে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিনই ছিল| সেই সময় আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যা প্রকট ছিল| খাদ্যসমস্যা ছিল প্রকট| আরো নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত ছিল দেশ| সদ্যস্বাধীন একটি দেশের সরকারের পক্ষে সেসব সমস্যা সমাধান করা বেশ কঠিন ছিল| তারপরও আমরা যদি ১৯৭১-১৯৭২ থেকে ১৯৭৪-১৯৭৫ অর্থবছর পর্যন্ত উন্নয়নের গতিধারাকে বিবেচনায় নিই, তাহলে দেখব, সেই সময় প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কম ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই প্রবৃদ্ধির হার স্বাধীনতাপূর্ব সময়ের চেয়ে বেশি ছিল| এটা একটি লক্ষণীয় বিষয় বটে| স্বাধীনতা পরবর্তী এক দশকের প্রবৃদ্ধি আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক দিকও বটে| পরবর্তী দশক অর্থাত্ ’৮০ দশকে আমাদের প্রবৃদ্ধির বেশি ছিল| তবে তা সত্তরের দশকের তুলনায় খুব একটা বেশি ছিল না| ’৮০ দশকে বাংলাদেশ গড়ে ৪ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে| এই সময় প্রবৃদ্ধির হার তেমন একটা বাড়ানো যায়নি| অনেকেই এজন্য ’৮০ দশককে ‘লস্ট ডিকেট’ বলে থাকেন| কিন্তু ’৮০ দশকে আমাদের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়| এই সময় তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ শুরু হয়| একই সময় এনজিওরা এই সময় তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যক্রম জোরদার করে| বিশেষ করে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে এনজিওরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| তারা গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীদের সম্পৃক্ত করে| সরকারের পক্ষ থেকেও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ করে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়| গ্রামীণ নারীদের মধ্যে আর্থিক কার্যক্রম এবং সামাজিক নানা বিষয়ে সচেতনতা গড়ে ওঠে| সরকারিভাবেও বেশ কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে| অর্থাত্ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে পরিবেশ তা সেই সময়ই সূচিত হয়| ৯০ দশক থেকেই আমাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা শুরু হয়| উচ্চ প্রবৃদ্ধির সেই ধারা এখনো বহাল রয়েছে| এই সময় আমাদের দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রতি দশকে ১ শতাংশের মতো করে বেড়েছে| ’৮০ দশকে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাড়ে তিন থেকে ৪ শতাংশ| করোনাপূর্ব সময়ে সেই প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের ওপরে চলে গেছে| আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই যে ধারাবাহিক অগ্রগতি তা অনেকটাই বিরল| বিশ্বে খুব কম দেশই আছে, যারা আমাদের মতো এমন ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে| আশ্চর্যজনক মনে হলেও, এটাই সত্যি যে, আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা টেকসই ভাবে ধরে রাখতে পেরেছি| কাজেই আমি বলব, আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাটা অনেকটাই টেকসই|’
আমরা যদি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয় এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হতে চাই, তাহলে এখনই কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে| বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু দুর্বলতম দিক আছে, যা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে| নির্ধারিত লক্ষ্যার্জন অসম্ভব নয়, তবে কঠিন বটে| সরকার কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, কিন্তু তার মধ্যে অসংগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে| এই মুহূর্তে আমাদের উন্নয়নের গতি বাড়াতে হলে কর্মসংস্হান সৃষ্টি, বিনিয়োগ, বিশেষ করে ব্যক্তি খাতে স্হানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে| সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল জিডিপির ২৮ শতাংশ| কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি| গত অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপির ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন| স্বাধীনতার পর আমাদের বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপির ১০/১২ শতাংশ| এখন তা প্রায় ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে| কিন্তু সরকারি খাতে বিনিয়োগ যেভাবে বেড়েছে ব্যক্তি খাতে সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি| কিন্তু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ব্যতীত সবার জন্য উপযুক্ততা অনুযায়ী কর্মসংস্হানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং কার্যকর দারিদ্র্য বিমোচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়| সরকারি খাতে যে বিনিয়োগ হয় তা কর্মসংস্হান সৃষ্টিতে তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে না| সরকারি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে মাত্র| সরকার দেশের বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন স্হানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্হাপনের কাজ করছে| এসব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের পর স্হানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জিত হবে| বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি নিয়ে এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে আসবেন| কিন্তু তারা তো কর্মী নিয়ে আসবেন না| স্হানীয়ভাবেই কর্মী জোগান দিতে হবে| আমরা কি দক্ষকর্মী জোগান দিতে পারব? আমাদের কি তেমন দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত লোকবল আছে? এ মুহূর্তে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য সবার আগে প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ লোকবল তৈরি করা| প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্হা বেকার তৈরির কারখানা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে| উন্নত দেশগুলোতে কারিগরি শিক্ষার হার ৬০/৬৫ শতাংশ| আর আমাদের ক্ষেত্রে এটা মাত্র ১৪/১৫ শতাংশের মতো| উপযুক্ত কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটানো ছাড়া বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যাবে না| তাই প্রয়োজনে প্রত্যেকটি জেলা পর্যায়ে কিছু কলেজের সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখে হলেও কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে| বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্হার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে| ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্হার সুফল কাজে লাগাতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্থনৈতিক উন্নযন সম্ভব নয়| কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ সাধারণত বেকার থাকে না| সরকারি চাকরির মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়| এজন্য নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে| পুরো জাতিকেই কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ উদ্যোক্তা শ্রেণিতে পরিণত করতে হবে| প্রতিটি কর্মীর হাতকে দক্ষ উদ্যোক্তার হাতিয়াতে পরিণত করতে হবে| এটা করতে না পারলে আমাদের পক্ষে ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে না| শুধু মুখের কথায় ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া যাবে না| এজন্য সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে|
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতিবিষয়ক
