একবিংশ শতাব্দীর মানুষের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন| মানুষকে বেঁচে থাকতে এমনিতেই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে হয়| আর এ শতাব্দীতে পৃথিবীর মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতা বা হুমকি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন| জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের আবহাওয়ার ধরন দিনদিন পরিবর্তিত হচ্ছে| সঠিকভাবে কোনো ঋতুতেই আমরা প্রকৃতির কাছ থেকে স্বাভাবিক আচরণ পাচ্ছি না| বৃষ্টির সময়ে অনাবৃষ্টি, খরার সময়ে বৃষ্টি কিংবা শীতের সময়ে গরম এগুলো সবই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব|
পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে কখনোই জলবায়ু এক থাকেনি| কখনো খুব উষ্ণ ও শুষ্ক থেকেছে| আবার কখনো শীতল হয়ে বরফে ঢেকেছে| কিন্তু এ পরিবর্তন ছিল অত্যন্ত ধীরগতির| মনে করা হয় আগেকার দিনে জলবায়ু পরিবর্তিত হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লেগেছে| কিন্তু বর্তমান সময়ে এই পরিবর্তনটা ঘটছে খুব দ্রুত ও আশঙ্কাজনকভাবে| গত ১০০ বছর পূর্বের গড় তাপমাত্রার তুলনায় পৃথিবীতে প্রায় ০.৬ সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে| বিজ্ঞানীদের ধারণা ২১ শতকের সমাপ্তিকালের মধ্যে গড়ে প্রায় আরো অতিরিক্ত ২.৫ থেকে ৫.৫ সেলসিয়াস তাপমাত্রা যুক্ত হতে পারে| এর ফলে পর্বতের উপরিভাগের জমাকৃত বরফ ও মেরু অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির উষ্ণতা বৃদ্ধি পাবে| পরিসংখ্যান বলছে, গত শতাব্দীতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে ২৩ শতাংশ আর নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে ১৯ শতাংশ| বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| আর এক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলে সৃষ্টি হচ্ছে ক্রমশ পুরু একটি গ্যাসের স্তর বা চাদর| এর ফলে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ছেড়ে দেওয়া তাপ পুনরায় ফেরত যায় না| বরং তাপ শোষণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে|
বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে ধারা শুরু হয়েছে তাতে বিশ্বের স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে| ধারণা করা হয়,পৃথিবীর উষ্ণায়নের ফলে একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অন্তত ২০ শতাংশ মানুষের সরাসরি ভাগ্য বিপর্যয় দেখা দিতে পারে| এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ ফুলে উঠলে আবহাওয়ার প্রকৃতিই বদলে যাবে| এতে করে সময়ে-অসময়ে জলোচ্ছ্বাসের শিকার হতে পারে উপকূলবাসীরা| ফলে লোকালয়ে লোনা পানি প্রবেশের ঝুঁকি বাড়বে, বনাঞ্চল ধ্বংস হবে, বন্য জীবজন্তুদের জীবন পড়বে হুমকির মুখে| পাশাপাশি বাড়তে পারে জীবনযাত্রার ব্যয় ও শরণার্থী সমস্যা|
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এডিবির একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়, উষ্ণায়নের ধারা ২০৫০ পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ এশিয়ায় শস্য উত্পাদন উল্লেখযোগ্যহারে কমে যাবে| জলবায়ুর অন্য আনুষঙ্গিক পরিবর্তনের প্রভাবে এশিয়ার ১৫০ কোটির বেশি মানুষ সরাসরি পানি ও খাদ্য ঝুঁকিতে পড়বে| ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের তথ্য মতে, ২০৩০-এর পর নদীর প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যেতে পারে| ফলে এশিয়ায় পানি স্বল্পতা দেখা দিবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে| যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকরা ধারণা করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান আরো বাড়বে|
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগের| সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন, আকস্মিক বন্যা, উত্তরবঙ্গে খরা বৃদ্ধি, দক্ষিণবঙ্গের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এর অন্যতম কারণ| ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালে প্রতি পাঁচ জনের একজন বাস্ত্তচু্যত হবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে| বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে বাংলাদেশে এখন প্রতি বছর ৪ লাখ মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছে| এ সংখ্যা প্রতিদিন দুই হাজারের মতো| জাতিসংঘও তার সতর্কীকরণে বলছে, পরবর্তী ৫০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩ ফুট বাড়লে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ১৭ শতাংশের মতো ভূমি পানির নিচে তলিয়ে যাবে| এতে করে আনুমানিক ৩ কোটি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্ত্তুতে পরিণত হতে পারে| সমুদ্র তীরবর্তী ভৌগোলিক অবস্হান, মাত্রাতিরক্ত জনসংখ্যা, অপ্রতুল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং এর ওপর অধিক নির্ভরশীলতা ইত্যাদি কারণে জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ|
উপর্যুক্ত পরিসংখ্যান আঁতকে ওঠার মতোই| কিন্তু তারপরও পৃথিবীর মানুষ এখনো এ বিষয়ে যতটুকু সচেতন হবার তা হয়ে উঠতে পারেনি| ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ১৯৭টি দেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল| কিন্তু দেশগুলো এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ| এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবী খুব দ্রুতই বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠবে| বিশ্বের স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশ পড়বে ব্যাপক ক্ষতির মুখে| কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকরণের যোগসূত্র এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি| তাই বিশ্ব মোড়লদের উচিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং একসঙ্গে কাজ করা| পাশাপাশি আমাদেরকেও যার যার জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে|
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ।
