১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহিদ এবং কয়েক লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় একটি পতাকা। শাসকগোষ্ঠীর পৈশাচিক থাবা থেকে নিজ মাতৃভূমির বিজয় ছিনিয়ে আনতে এদেশের মানুষের বুকে ছিল এক অসীম সাহস। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিজয়ের ঘটনাই ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য যোজনা, যা অর্জিত হয়েছিল দেশের অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ মানুষের হাত দিয়ে। তারা ছিলেন ছাত্র-কৃষক-কুলি-মজুর-শিক্ষক-সাংবাদিক-চাকরিজীবী। তাদের না ছিল কোনো অস্ত্র, না ছিল প্রশিক্ষণ।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এদেশের মানুষ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এক দাসত্ব থেকে আরেক দাসত্বে রূপান্তরিত হয়। ফলে দাস দাসই থেকে যায়, বদলে যায় মনিব। প্রায় ২০০ বছরের উপনিবেশবাদের চরম আধিপত্য এবং ২৩ বছরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতায় বাঙালি জাতি শিক্ষা- সংস্কৃতি-মেধা-বাণিজ্য সর্বদিক থেকে পিছিয়ে যায়। ভেঙে দেওয়া হয় অর্থনীতি। বাধাপ্রাপ্ত হয় সংস্কৃতিচর্চা। পূর্ব বাংলার উন্নয়নও ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। বঞ্চিত করা হয় সব মৌলিক অধিকার থেকে। সর্বোপরি ২৪ বছরের দীর্ঘ শাসন-শোষণে এক অদৃশ্য দুর্ভিক্ষের রোষানলে ছিল বাঙালি জাতি। এই দুর্ভিক্ষ কেবল অধিকারের কিংবা নির্যাতনের নয়, ব্যাপকভাবে মানসিকতারও।
বাঙালি জাতীয়তাবাদে ব্যাপক বহিঃপ্রকাশ ঘটে ’৬৬-এর ৬ দফা, ’৬৯-এর গণঅভু্যত্থান এবং সবশেষে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া শ্রমিক-মজুরসহ সব শ্রেণির মানুষের ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, বিজয়ের ৫০ বছর পর তা আমাদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে। যাদের হাতে শোভা পায় লাঙ্গল, জাল কিংবা কলম, তারাই হাতে তুলে নিয়েছিল মেশিনগান। অস্ত্র চালনার শূন্য জ্ঞান নিয়ে তারা লড়াই করে দক্ষ পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনীকে পরাজিত করে ছিনিয়ে আনে জয়।
১৯৭১ সালে যে লক্ষ্য ও আশা নিয়ে এদেশের বিজয় অর্জিত হয়, জন্মের ৫০ বছরে ততটুকু অগ্রগতি অর্জিত হয়নি অনেকক্ষেত্রেই। দুর্নীতি, চোরাচালান, দক্ষ মানবশক্তির অভাব, বেকারত্ব, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যসহ আরো নানান সমস্যায় জর্জরিত আমরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর জরিপ মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের দারিদ্রে্যর হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর সর্বশেষ জরিপ মতে বাংলাদেশে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ এবং নিঃসন্দেহে করোনা মহামারির ব্যাপক ঢেউয়ের পর তা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখনো দেশের অনেক স্হানে নিরাপদ পানি কিংবা পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদু্যত্ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশের বড় বড় শহরে আবাসন একটি বড় সমস্যা। বড় বড় শহরগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্ত্তহারা। বহু মানুষ এখনো তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। নেই কোনো বিধবা ভাতা কিংবা বয়স্ক ভাতার ব্যবস্হা। উচ্চশিক্ষার মানও খুব একটা মানসম্পন্ন নয়। বাংলাদেশের প্রায় সমসাময়িক সময়ে স্বাধীন হয়েও সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া উন্নয়নের প্রায় সব সূচকেই তারা বাংলাদেশের থেকে এগিয়ে আছে।
তবে আশার কথা এই যে, অনেক খাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধনে সক্ষম হয়েছে এবং উন্নয়নের ধারাও বজায় আছে। নিম্নআয়ের দেশ থেকে মধ্যমআয়ের দেশ হিসেবে আমরা স্বীকৃতি পেয়েছি। নারীশিক্ষা খাতেও বাংলাদেশ অনেক প্রশংসাজনক হারে এগিয়ে গেছে। মা ও শিশু মৃতু্যহার নিয়ন্ত্রণে আমরা পেয়েছি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরির যে স্বপ্নকল্প ছিল তা অনেকাংশেই অর্জিত হয়েছে। মহাকাশে আমরা নিজ দেশের নাম স্হাপন করেছি, যা বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে এক সম্মানজনক আসন দিয়েছে। তাই বিজয়ের ৫০ বছর পর পিছু ফিরে তাকালে অপ্রাপ্তির চেয়ে প্রাপ্তিই বড় করে দেখতে ইচ্ছে হয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
