‘আব্বু আম্মু ক্ষমা করে দিও, বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল, আপু, মুশাব্বিরের প্রতি খেয়াল রাখ’—ফেসবুকে এই স্ট্যাটাস দিয়া সম্প্রতি নিখোঁজ হইয়াছে ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শিব্বির আহমেদ। শিব্বির তাহার শেষ স্ট্যাটাসের পূর্বে সেইদিন ভোরে কয়েকটি স্ট্যাটাস দেয়। সেইখানে সে লিখিয়াছে—‘ভালো থাকবে জায়গা, সুখে থাকবে শহর।’ তাহার পর লিখিয়াছে—‘ঘর, পরিবার, জায়গা ক্ষমা করে দিও।’ বাবা-মায়ের নিকট ক্ষমা চাহিয়া স্ট্যাটাস দেওয়ার পর তাহার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বিভিন্ন জায়গায় খুঁজিয়াও তাহাকে আর পাওয়া যায় নাই।
তাহার পিতা জানাইয়াছেন যে, তাহার সন্তান সহজ-সরল, তাহার টাকাপয়সারও সমস্যা ছিল না। তাহা হইলে শিব্বির কেন জগত্সংসারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া পড়িল? মনে হইতে পারে, একজন তরুণ নিখোঁজ তো হইতেই পারে। প্রতি বৎসর কতশত ঘটনা এইরকম ঘটিতেছে। মনে হইতে পারে, ইহা লইয়া লিখিবার কী আছে? ইহা লইয়া উদ্বেগ প্রকাশেরই-বা কী আছে?
উদ্বেগের অনেক কারণ আছে বটে। একটি বিশেষ সময়কাল, একটি সমাজ-রাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিস্থিতি সুনির্দিষ্ট করিয়া দেয় কিশোর-তরুণেরা কী ধরনের মানসিকতা লইয়া বড় হইবে। ইহা অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ জিজ্ঞাসা এই কারণে যে, শাব্বিরের মতো শতসহস্র কিশোর-তরুণ আমাদের সমাজে মানসিক অসহায়ত্বে বসবাস করিতেছে। তাহাদের বুঝিবার কেহ নাই এবং তাহারা বিপথগামী হইলে সেইখান হইতে তাহাদের সঠিক পথের দিশা দেখাইবার সঠিক মানুষের সঠিক পরিবেশের এবং সঠিক সমাজব্যবস্থার অভাব রহিয়াছে। আমরা কিশোর-তরুণদের নিকট হইতে প্রত্যাশা করি যে, তাহারা সুবোধ বালকের মতো একদিকে ন্যায়পরায়ণ, কর্তব্যপরায়ণ হইবে, অন্যদিকে ঝকঝকে স্মার্ট হইবে। পড়াশুনায় তুখোড় হইবে, অন্যদিকে সে বাবা-মায়ের বাধ্য হইবে। স্কুলের গণ্ডি পার হইয়া সে যখন পরিবারের নিরাপদ সুরক্ষিত বেষ্টনীর বাহিরে প্রথম পা রাখে, তখন বাহিরের বিচিত্র ভালোমন্দ বৃহত্তর জগৎ তাহাকে ক্রমাগত হাতছানি দেয়। তাহাকে অস্থির করিয়া তোলে।
মনে রাখিতে হইবে, একজন কিশোর-তরুণ কীভাবে বৃদ্ধি-বিকাশ লাভ করিবে—তাহার পরিপ্রেক্ষিতটিও আমাদের বুঝিয়া নেওয়া প্রয়োজন। ইহার মধ্যে রহিয়াছে তাহার আর্থসামাজিক অবস্থান, লিঙ্গ বা জাতি, ভৌগোলিক অবস্থান, বাবা-মায়ের শিক্ষার ধরন, পারিবারিক জীবনচর্চা, গোষ্ঠীর ধর্মীয় সাংস্কৃতিক প্রভাব, পরিবেশের যৌন আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি অনেক কিছু। আমাদের পরিবারগুলিতে এখনো পিতাকে আদর্শ হিসাবে ধরা হয়। পিতার সততা-অসততা কিংবা যে কোনো ভালোমন্দ কর্মকাণ্ড প্রভাব ফেলে কিশোর-তরুণের মনে। নানা সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে, কিশোর-তরুণের বুদ্ধি বিকাশের ক্ষেত্রে দৈহিক, মানসিক, বৌদ্ধিক, সামাজিক ইত্যাদি বিভিন্ন দিকের অভিযোজন খুব জরুরি। এই সকল অভিযোজনের বিভিন্ন পর্যায়ের ভিতর দিয়াই একজন কিশোর বা তরুণ ব্যক্তি হিসাবে তাহার আপন পরিচয় বা ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
মনে রাখিতে হইবে, বয়ঃসন্ধিকালের সমস্ত পরিবর্তন পূর্বপরিকল্পনামাফিক হিসাব কষিয়া হয় না বা আগাইয়া চলে না। আধুনিক এই সময়ে বিশ্বায়ন, মহামারি এবং স্মার্টফোনের ভার্চুয়াল জগৎ কিশোর-তরুণের মানসিক জগেক বিশালভাবে প্রভাবিত করিতেছে। তাহাদের মনের উপর বহু ক্ষেত্রেই প্রচণ্ড চাপও সৃষ্টি করিতেছে। সুতরাং এই দিকগুলি আমাদের অর্থাৎ বাবা-মা ও অভিভাবকদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখিতে হইবে। বাবা-মায়ের ক্ষেত্রেও কতখানি কর্তৃত্ব দেখানো প্রয়োজন, কতখানি আবেগ-ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, গ্রহণ-বর্জন, মতৈক্য-মতানৈক্যর দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন—তাহা বুঝিতে হইবে। পরিবারে এই সকল বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করিবার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি থাকিলে কিশোর-কিশোরী-তরুণেরা তাহাদের সমস্ত মনের ভাবনা লইয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে নিজের ধারণাগুলি বিকশিত করিতে পারে। যেহেতু রাষ্ট্র-সমাজ বিশ্বায়ন এবং মহামারিতে কাহারো হাত নাই, সুতরাং এই অবস্থায় কিশোর-তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখিতে বাবা-মা তথা অভিভাবকদেরই সর্বাগ্রে সচেতন হইতে হইবে। দিনের শেষে পরিবারই সবচাইতে বড় রক্ষাকবচ।
