বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ও পরিবেশ

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২১, ০৮:১৫

যে মহান ব্রত, উদ্দেশ্য ও আশা নিয়ে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়, ক্যাম্পাসে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের র‌্যাগিং নামক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, থমকে যায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার আশা। 

র‌্যগিংয়ের মাধ্যমে তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার এমনকি বিকলাঙ্গ হচ্ছে, কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছে। হল, শ্রেণিকক্ষ, ক্যান্টিন, লাইব্রেরি, ক্যাম্পাসের নির্জন জায়গায় সর্বত্রই চলে র‌্যাগিং নামক শিক্ষার্থী টর্চার। ফলে, যাদের সামর্থ্য আছে তারা হল ছেড়ে আশ্রয় নেয় মেসে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতায় যুগের পর যুগ চলছে এই অপসংস্কৃতি। 

যারা নির্যাতিত হয়, তারা সেই শোধ মেটানোর জন্য এবং মানসিক বৈকল্যের কারণে পরবর্তী সময়ে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, তাদের ওপর চালায় অমানবিক এই অত্যাচার। কাডেট কলেজে থাকাকালীন আমি সিনিয়র ক্যাডেটদের বলতাম তোমরা ছোটদের অযথা পানিশমেন্ট দেওয়া থামাও। তারা বলত, স্যার জীবনে যে পানিশমেন্ট খেয়েছি, তা তুলতে হবে। আমি বলতাম, তোমরা সেক্রিফাইস করো, তোমাদের ব্যাচ থেকে এই উদাহরণ সৃষ্টি করো যে, তোমরা আর পানিশমেন্ট সিস্টেম টিকিয়ে রাখবে না। কিন্তু তারা তা করতে পারেনি।

গণমাধ্যম থেকে জানা যায় যে, গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন শতাধিক র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটেছে, যার মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত এক মাসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ২৭টি র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটে। ছাত্রছাত্রীনির্বিশেষে সবার ওপর চলে এই র‌্যাগিং নামক নির্যাতন। এ পরিসংখ্যান শুধু তাদের, যাদের ব্যাপারে পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। অজানা অনেক তথ্য আছে, যেগুলো এ হিসাবে আসেনি। এ কেমন কালচার! কেন আমরা এটিকে টিকিয়ে রাখছি? কোথা থেকে এই কালচার এলো? একদিকে ছাত্রনেতা ও ক্যাডারদের অত্যচার, অন্যদিকে আবার এই র‌্যাগিং! আমরা আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, তখনও র‌্যাগিং বর্তমানকালের মতো শুরু হয়নি, যদিও ছাত্রনেতাদের দৌরাত্ম্য ও অত্যাচার ছিল কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

আমাদের প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হওয়ার পর কয়েক মাস একটানা চলেছে। তখন প্রথম বর্ষের অনেকেই একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচার জন্য শীতকালীন বন্ধ এগিয়ে আনার দাবি তুলে মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তখন আমাদের সিনিয়র ভাইয়েরা আমাদের তাড়া করেছিল, আমরা যাতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের কথা মুখে না আনি। তাদের যুক্তি ছিল তাদের কারোর কারোর চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে, কারোর মাথা টাক হয়ে যাচ্ছে। অতএব কোনো বন্ধ নয়। তারা তাড়াতাড়ি বের হয়ে চাকরি করবেন। র‌্যাগিংয়ের নামে অত্যাচার ছিল না। তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার আগে অর্থাত্ মাস্টার্স পরীক্ষার আগে র‌্যাগ ডে পালন করা হতো, সেখানে অত্যাচার বা নির্যাতনের কিছু ছিল না, ছিল হাসি-আনন্দ, কৌতুক ইত্যাদি। 

প্রথম বর্ষে ছিল নবীনবরণ, আমাদের নবীনবরণ হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে। সব বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ডেকে সব বিভাগীয় প্রধান, রেজিস্ট্রার, ভিসি, ডিন ও বিভাগীয় প্রধানগণ প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের অনেক উপদেশ পরামর্শ দিয়ে বরণ করে নিতেন। ক্যাডেট কলেজে দেখেছি প্রথম দিন সমস্ত ক্যাম্পাস সাজিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিবাদন জানানো হয়। পরে তিন মাস পরে ইনডাকশন প্যারেডের মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুরোনোদের আনুষ্ঠানিকভাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়, যেদিন অভিভাবকসহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, খাওয়াদাওয়া হয়। এগুলো তো ভালো কালচার। কিন্তু বর্তমানকালের র‌্যাগিং অনেকটাই নতুন আমদানি। 

র‌্যাগিং শিক্ষার্থীদের হিংস্র মানসিকতার কিছু বহিঃপ্রকাশ, যার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারের প্রাণ গেল, আরো ২০ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন হলো। তারা কেউই এই কাজ করতে বুয়েটে ভর্তি হয়নি অথচ পরিবেশ ও কালচারের কারণে সবার জীবনে নেমে এসেছে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ মানসিকতার চর্চা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের অনুশীলন অথচ এসব বিসর্জন দিয়ে কিছু শিক্ষার্থী যেসব অপসংস্কৃতি চর্চা করছে, তা বন্ধ করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষার মানও।

জানা যায়, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের কর্মসূচিতে যেতে না পারলে, বাড়ি যেতে চাইলে ‘গেস্ট রুমে বড় ভাইদের’ কাছ থেকে ছুটি নিতে হয়। রাতে এসব রুমে ডেকে এনে নিরীহ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়। এই সংস্কৃতির মূল উত্স হচ্ছে সিট দখল নিয়ে আধিপত্য। তারা আবার বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এসব আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। আর সাধারণ ছাত্ররা রাতে ঘুমাতে না পেরে ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে বিরক্ত, অতিষ্ঠ ও পরে অনেকে অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। 

কী শিখতে এসেছে শিক্ষার্থীরা এসব উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর কী শিখছে? অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা, এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে উঠবস করানো, চেয়ার ছাড়া চেয়ারে বসার ভান করানো, মাটিতে বসে দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে কান ধরে মুরগি হওয়াসহ নানা ধরনের নির্যাতন।

পায়ের নিচ দিয়ে কান ধরিয়ে স্ট্যাম্পের ওপর বসানো এবং স্টাম্প ও প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে বেধড়ক প্রহার। থাপ্পড় দেওয়া, দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা, এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, একশত বার সালাম দেওয়ানো, অর্ধনগ্ন করে ছবি তোলা। কান ধরে ওঠবস করানো, দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে বা এক টাকার কয়েন দিয়ে রুমের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মাপতে দেওয়ার মতো অভিনব পম্হায় শাস্তি প্রদান করা হয়। অনেক শিক্ষার্থী হল ছেড়ে নিকটবর্তী মেসে ওঠে, কিন্তু সেখানেও রেহাই নেই এই র‌্যাগিংয়ের হাত থেকে।

র‌্যাগিং শুধু শারীরিক নয়, এক ধরনের মানসিক নির্যাতনও। এর মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থীদের মনে ভীতির সৃষ্টি হয়। ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার্থীরা সদাচার শেখার পরিবর্তে তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি জন্মে ঘৃণা আর ভয়ের সংস্কৃতি। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, যদিও বিষয়টি নিয়ে কেউ আর তেমন তৎপর নন, কারণ তারা চাকরি করেন, বেতন আসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি থাকুক আর না থাকুক তাতে তো কারোর কিছু যায়-আসে না। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র অনেকটা পালটে গেছে আবরার হত্যার পর। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরদারি বেড়েছে। কমেছে র‌্যাগিং। ২০১৯ সালের অক্টোবরের আগে যা হতো তা হচ্ছে জুনিয়র শিক্ষার্থীরা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সালাম না দিলেও শুরু হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অথচ এত মেধাবী ও সিনিয়র শিক্ষার্থীদের এসব নিয়ে ভাবারই সময় ছিল না। তথাকথিত রাজনীতি তাদের এভাবে পালটে দিয়েছে। আবরার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘আবরার হত্যার মূল কারণ কলুষিত ছাত্ররাজনীতি। আমি বলব, পাশাপাশি বড় দলগুলোকেও দণ্ড দিতে হবে। তাদের আশকারাতেই এই ছাত্ররা বেপরোয়া হয়েছে। এটা কি ছাত্ররাজনীতি? ষাটের দশকে তো আমরাও ছাত্ররাজনীতি করেছি। 

এখন কেন রাজনীতি কলুষিত হলো? যেসব শিক্ষার্থীদের ফাঁসির রায় হলো, পাঁচ জনের যাবজ্জীবন হলো। তাদের বাবা-মাকেও এই বেদনা সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। অথচ এই ছেলেরা তো মেধাবী, তারা তো প্রকৌশলী হয়ে দেশের সেবা করতে পারত।’ তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত।’

শুধু উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি ব্লেন্ডেড লার্নিং, ই-লার্নিংসহ নিয়মিত গবেষণা ও উন্নতমানের শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করছে, যাতে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে না পড়ে এবং শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে। আর আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের অবনতি ঘটেই চলছে ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষক-রাজনীতি ও মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রতি সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার কারণে। করোনা অতিমারিতে তা আরো প্রকট হয়েছে। গত দুই বছরে শিক্ষাঙ্গনে নেমে এসেছে প্রায় স্থবিরতা। এর বাইরেও রয়েছে নানা সমস্যা, অনিয়ম ও দুর্নীতি। 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাত্র খুলেছে অথচ র‌্যাগিংও শুরু হয়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করলে এগুলো থাকত না বলে অনেক শিক্ষাবিদ মন্তব্য করেছেন। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনেক সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে যদি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা প্রকৃত শিক্ষার আলয়ে পরিণত করতে চাই। জাতীয় উন্নয়নের বিভিন্ন সূচক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন সূচক নিয়ে ভাবতে হবে। শিক্ষাদান, গবেষণা, প্রকাশনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সুযোগ-সুবিধার বিভিন্ন উপাদান ও পরিচালনের নানাদিক বিবেচনায় নিয়ে বৈশ্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘র‌্যাংকিং’ করার ব্যবস্থা রয়েছে।

বস্ত্তত একাধিক র‌্যাংকিং অনুশীলন কার্যকর রয়েছে, কিন্তু প্রায় সব র্যাংকিং অনুশীলনেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নেই। এ নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তাও নেই। গোটা বিশ্বে এখন চলছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ঢেউ। প্রথম শিল্পবিপ্লব স্টিম ইঞ্জিন, দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব বিদ্যুৎ, তৃতীয় শিল্পবিপ্লব কম্পিউটার ও ইন্টারনেট এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে। 

সেই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তথা চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের দেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশে প্রচলিত উচ্চশিক্ষার সিলেবাস ও কারিকুলাম অনুরূপ দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য পর্যাপ্ত অনুকূল নয়। সেজন্য উচ্চশিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষাদানের মান উন্নত করা, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলোতে সম্পৃক্ত করা, তাদের উপলব্ধি করানো, উন্নত শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা এবং র‌্যাগিং ও ছাত্ররাজনীতির অপসংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে হবে। 

এজন্য শিক্ষার্থীদের নিজেদের, শিক্ষকসমাজ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের সর্বোচ্চ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং নিয়োগের পর শিক্ষকদের অবশ্যই সৃষ্টিশীল ও গবেষণামনস্ক, নিষ্ঠাবান, আন্তরিক, পরিশ্রমী ও উন্নত নৈতিকতা সম্পন্ন হওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব) 

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন