বাঙালির আধুনিক যুগের ইতিহাসে যে নারীর নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, তিনি হচ্ছেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। বাঙালি সমাজ যখন ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা আর সামাজিক কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল, সেই সময় বেগম রোকেয়া বাংলার মুসলিম নারী সমাজে শিক্ষার আলো নিয়ে এসেছিলেন। আজ থেকে শত বছর আগে ১৯০৫ সালে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ লেখার মাধ্যমে উপমহাদেশে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি।
এর এক বছর আগে মতিচূর নামক প্রবন্ধগ্রন্থে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের মাধ্যমে সমাধিকার প্রাপ্তির আহ্বান জানিয়েছিলেন। আর উপমহাদেশে নারীদের পশ্চাত্পদতার কারণ হিসেবে নারী শিক্ষার অভাবকে দায়ী করেছিলেন। এই উপমহাদেশে নারীকে পুরুষের সমকক্ষ মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন তিনি।
উনিশ শতকের শেষের দিকে জন্মগ্রহণ করেও চিন্তা আর চেতনায় সময়ের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন বেগম রোকেয়া। তার সমসাময়িক নারী তো দূরের কথা, আলোকিত চিন্তায় অনেক পুরুষের চেয়েও এগিয়ে ছিলেন তিনি। এমনকি আজকের দিনেও তার বক্তব্য সমান গুরুত্ব বহন করে। আজ থেকে ১১৫ বছর আগেও নারীকে ধর্ম ও সামাজিকতার দোহাই দিয়ে ঘরে আবদ্ধ রাখতে চেয়েছে পুরুষ, আজ এই একবিংশ শতাব্দীতেও নারীর এগিয়ে চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় পুরুষতান্ত্রিকতা। শত বছর আগে বেগম রোকেয়া এই সমাজে নারীদের চারপাশে যে শৃঙ্খল দেখেছিলেন তা আজও কি বিদ্যমান নয়? হ্যাঁ, বর্তমানে সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। নারীরা যে এগিয়েছে, তা স্বীকার করতে কার্পণ্য নেই। দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলীয় নেতা নারী, স্পিকার নারী, অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতা নারী, নারীরা বিচারপতি হচ্ছেন, উড়োজাহাজ চালনা করছেন, মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছেন, আরো কত কিছুই না করছেন তারা। কিন্তু এগুলোই কি সব? এসব উদাহরণ কি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের নারীদের উচ্চস্থান নিশ্চিত করে? অন্যান্য দেশের তুলনায় এই দেশের নারীরা কি খুব একটা এগিয়েছে? বর্তমান সময়ে নারীদের ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন কি বন্ধ হয়েছে? আজও কি এই সমাজে নারীদের সমমর্যাদায় দেখা হয়? বেগম রোকেয়া যে চিন্তা উনিশ শতকে করে গিয়েছেন আজকের সমাজ সেই চিন্তাকেও ধারণ করতে পারছে না পুরোপুরি। বেগম রোকেয়াকে সংগ্রাম করতে হয়েছিল কিন্তু জীবনের ওপর কোনো হুমকি তিনি তেমন অনুভব করেননি। মৌলবাদীদের হুমকি থাকলেও তিনি সেটাকে মোকাবিলা করার সাহস দেখিয়েছিলেন।
নারীদের অগ্রযাত্রার পেছনে প্রকৃতপক্ষে কার্যকর বাধা কারা? নারীদের অধিকার আদায়ে প্রধান অন্তরায় কী? এ বিষয়ে বিস্তারিত বলে গেছেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, যা আজকের বাস্তবতায় প্রণিধানযোগ্য। নারীদের এই অবস্থানের জন্য তিনি প্রথমে দায়ী করেছেন নারীদেরই। বেগম রোকেয়া স্ত্রী জাতির অবনতিতে লিখেছেন, আমাদের আদর লোপ পাওয়ায় আমরাও অনুগ্রহ গ্রহণে আর সংকোচ বোধ করি না। বাংলাদেশের প্রত্যেক তরুণী বেড়ে ওঠে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বুকে ধারণ করে। কিন্তু বাস্তবতার কশাঘাতে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
এক শতাব্দী আগে বেগম রোকেয়া যে নারী মুক্তির কথা বলে গেছেন, নারী মুক্তির পথ দেখিয়েছেন এবং ‘জাগো গো ভগিনী’ বলে নারীদের জেগে ওঠা ও জেগে থাকার তাগিদ দিয়ে গেছেন, তা আজও তাদের হৃদয়ে আমরা অনুরণিত করতে পারছি কি? না, দেশের প্রতিটি জনপদে আমরা যদি একেক জন বেগম রোকেয়ার জন্ম ও বিকাশ সম্ভব করতে পারি, তাহলেই বাঙালি নারীর মুক্তির পথ সুগম হবে। মনে রাখতে হবে, বেগম রোকেয়া নিজের সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে থেকেই মুক্তির কথা বলতেন। তিনি ধর্মপ্রাণ ছিলেন; কিন্তু ধর্মবিশ্বাস তার মুক্তচিন্তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সব ধর্মই কি নারীকে শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়ে মর্যাদার আসনে বসানোর কথা বলে না?
বেগম রোকেয়াকে অনেকে নারীবাদী বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু তিনি পশ্চিমা নারীবাদের পথে হাঁটেননি। বরং উপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রামে নারীর শক্তিকে সন্নিবেশিত করার আহ্বান রেখেছেন। তিনি নারীর অধস্তনতাকে প্রথাগত চিরন্তন অধস্তন অবস্থা বলে স্বীকার করেননি। উলটো এ সম্পর্কিত তার ব্যাখ্যায় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের কিছু প্রকাশ দেখা যায়। ‘আদিমকালে যখন সভ্যতা ছিল না, সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমরা এ রূপ দাসী ছিলাম না।’ রোকেয়া সুস্পষ্টভাবে বুঝেছিলেন যে, সমাজের বিধি-ব্যবস্হা নারী-পুরুষের স্বার্থকে বিপরীতমুখী করে রাখে। তাই এ সমাজের নারীমুক্তির প্রশ্নকেও স্বদেশের উপযোগী করেই আলোচনা করেছেন। সমাধান খুঁজেছেন নিজ মাটিতে। আমরা যদি একটি নারীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, নারীকে তার প্রাপ্য অধিকারের জায়গায় দেখতে চাই তাহলে বেগম রোকেয়াকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
লেখক: শিক্ষার্থী, নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
