বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হইল পোশাকশিল্প। তৈরি পোশাক রপ্তানি করিয়া দেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হইতেছে। স্বাধীনতার পরের বৎসর বাংলাদেশ ৩৪ কোটি ৮৪ লক্ষ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করিয়াছিল, যাহার ৯০ শতাংশ ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। আর গত ৫০ বৎসরে দেশের অর্থনীতির খোল-নলচে পালটাইয়া দিয়াছে তৈরি পোশাক খাত। বর্তমানে মোট রপ্তানির ৮৩ শতাংশই হইল তৈরি পোশাক। প্রায় ৪০ লক্ষ গ্রামীণ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করিয়াছে এই শিল্প।
চীনের পর একক দেশ হিসাবে দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশ। সকল মিলাইয়া তৈরি পোশাক খাত এখন এক বিস্ময় সৃষ্টি করিয়াছে। এই খাতের যে কোনো বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতাকে তাই দ্রুত আমলে নেওয়া একান্ত প্রয়োজন; কিন্তু আমরা গভীরভাবে লক্ষ করিতেছি যে, এই শিল্পে বিভিন্ন নিদারুণ ঝামেলা লাগিয়াই আছে। তন্মধ্যে একটি হইল—রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস পণ্য ঢাকা হইতে চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে চুরি হইয়া যাওয়া। চোরাই এই সকল পণ্য নেপাল ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পাচার হইতেছে। ইহাতে বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্টসহ বাজার হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। করোনার সময় এই শিল্পকে রক্ষায় আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ লইয়াছি। তদ্রূপ এখন এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় আসিয়াছে।
আমরা বিভিন্ন সময় চট্টগ্রাম বন্দরগামী ট্রাক ও লরি হইতে তৈল চুরি লইয়া সম্পাদকীয় লিখিয়াছি। এই তৈল চুরির একটি সংঘবদ্ধ চক্র রহিয়াছে। সেই চক্রই গার্মেন্টস পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যান হইতে গার্মেন্টস পণ্য চুরি করিতেছে কি না, তাহা তদন্ত করিয়া দেখা দরকার। তৈলচোরেরা যতটা ক্ষতি করিতেছে দেশের, তাহার চাইতে অধিক ক্ষতি করিতেছে গার্মেন্টস পণ্য চোরাকারবারিরা। কেননা ইহার সহিত বিদেশে আমাদের সুনাম-সুখ্যাতির বিষয়টি সরাসরি জড়িত। একবার যদি আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, তাহা হইলে এই শিল্পের প্রভূত ক্ষতি হইয়া যাইবে। আমাদের জানিয়া রাখা উচিত, কোটাব্যবস্থা উঠিয়া যাওয়া, তাজরিন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হওয়া ও রানাপ্লাজা ধসের পর এই শিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খাইয়াছিল। ইহা হইতে পরিত্রাণ লাভে আমাদের বহু কষ্ট ও চেষ্টাচরিত্র করিতে হইয়াছে।
এখন চোরাকারবারিদের ঘটনাকে নগণ্য বলিয়া অবহেলা করিবার কোনো অবকাশ নাই। সংঘবদ্ধ চোর চক্রটি পথিমধ্যে ড্রাইভার ও গাড়ির মালিকের সহিত যোগসাজশে কৌশলে কার্টন হইতে পণ্য চুরি করিয়া লইতেছে বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। চুরির পর কার্টনগুলি কোনো কিছু ভরিয়া তাহারা হুবহু পূর্বের ন্যায় করিয়া রাখিয়া দিতেছে। বিদেশি ক্রেতারা পণ্য কম পাওয়ার অভিযোগ আনিতেছে এবং ইহা লইয়া রপ্তানিকারকদের সহিত তাহাদের বচসার ঘটনা ঘটিতেছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই চক্রের একটি গ্রুপকে গ্রেফতার করিলেও এই ব্যাপারে আতঙ্ক পুরাপুরি কাটে নাই।
২০১৮-১৯ অর্থবত্সরে আমাদের পোশাক খাতের রপ্তানি ছিল ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় ইহার পরিমাণ ২ লক্ষ ৯০ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। করোনার কারণে রপ্তানি কিছুটা হ্রাস পাইলেও এই খাত এখনো সম্ভাবনাময়। আগামী ১৫-২০ বৎসর অনায়াসে ইহা আমাদের অর্থনীতিকে নেতৃত্ব দিবে। ইহার পর হয়তো চাহিদা ও নির্ভরশীলতা কমিতে পারে। সুতরাং পোশাকশিল্পের যে কোনো সম্ভাবনাকে কাজে লাগাইতে হইবে। এই শিল্পের বিকাশের অন্তরায়গুলি দূর করিতে হইবে সম্মিলিত ও সমন্বিতভাবে। এই জন্য চোর চক্রের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা দরকার। তাহাদের বিরুদ্ধে যথাসম্ভব দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
