বাঁচতে কে না চায়? এ দেশের ১৭ কোটি মানুষের সবাই বাঁচতে চায়, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চায়, চায় সঠিক চিকিৎসাসেবা। কিন্তু বৈষম্যের এই দেশে খাদ্য, শিক্ষা, চাকরি, যোগাযোগ ও যাতায়ত—রাষ্ট্রীয় জীবনের এমন প্রায় সব ক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। এগুলোর পাশাপাশি চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রকট বৈষম্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে করোনার প্রাদুর্ভাবকালীন ও তার পরবর্তীকালে।
করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবার জন্য সীমিত সরকারি ভেনটিলেশন সার্ভিসের বেশির ভাগই ছিল ঢাকাসহ দু-একটি বিভাগীয় বড় শহরের হাসপাতালে। চাহিদার তুলনায় জোগান অল্প থাকলে শক্তি বা ক্ষমতা প্রদর্শন কোনো নতুন বিষয় নয়; তার পরেও তা যদি হয় জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে। সাধারণ মানুষের সেবার জন্য ছোটাছুটি আর মৃত্যুর হাহাকারের হৃদয়বিদারক ছবি এসেছে মিডিয়ায়। মানুষ দেখেছে স্বাস্থ্য খাতের অস্বাস্থ্য। সামান্য অ্যাম্বুলেন্সের বা অক্সিজেন সিলিন্ডারের অভাবেও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবরের কমতি ছিল না সংবাদমাধ্যমে। এমনকি ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে শহরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফাইজার আর মডার্না ভ্যাকসিনের ব্যবস্হা, আর গ্রামঞ্চলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সিনভ্যাকের সরবরাহ চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈষম্যকে আরো প্রকট করে তুলেছে। এগুলো দেখে প্রশ্ন জাগে, বিত্তবান নাগরিক হতে না পারাটা কি পাপ, যা মানুষের মৃত্যুকেও ত্বরান্বিত করে?
বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫(ক) ও ১৮(১) নং অনুচ্ছেদে স্বাস্থ্য সুরক্ষা রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃত। আবার ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। এর পাশাপাশি ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে সবার জন্য সমতা অধিকারের কথা বলা আছে। সর্বোচ্চ আইনের এমন প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতি ও নিশ্চয়তা মানুষকে আশান্বিত করে যে, তারা দেশ থেকে অন্তত সঠিক চিকিৎসা পাবে। রাষ্ট্রের সহযোগিতায় অন্তত পয়সার অভাবে মানুষকে মরতে হবে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন! সরকারি বা বেসরকারি যাবতীয় চিকিৎসার সুযোগ বেশির ভাগই নগর অঞ্চলকেন্দ্রিক। আর চিকিৎসাগুলোও যেন ‘পধঃপয সব, রভ ুড়ঁ পধহ’-এর মতো। অনেক ক্ষেত্রেই এ দেশে চিকিৎসা আপনি পাবেন, যদি আপনি তা ম্যানেজ করতে পারেন। অবশ্য পয়সা বা ক্ষমতাও সব সময় সুচিকিৎসার গ্যারান্টি দেয় না। সেই আলোচনা আবার আলাদা। অথচ উন্নত রাষ্ট্রে, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকেও একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেখে যায়। এর কারণ, সেখানে আছে বৈষম্যহীন চিকিৎসাসেবা, আর দেশের হাসপাতালেই উন্নত চিকিৎসার নিশ্চয়তা। জনগণের অর্থে যখন রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের বা প্রভাবশালীদের চিকিৎসার জন্য সব ধরনের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়, অন্যদিকে পত্রিকার পাতায় বা সামজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেঁচে থাকার আকুতি আর চিকিৎসার জন্য মানবিক সাহাঘ্যের আবেদন দেখতে হয়, তখন তা সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে আপনাকে বিমর্ষ করবেই। অনেক ক্ষেত্রের মতো, তখনো ভাবতে হয়, আসলেই কি সংবিধানে (৭ নম্বর অনুচ্ছেদ) প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ, নাকি বিশেষ কিছু সুবিধাপ্রাপ্ত জনগণ!
স্বাধীনতার অর্ধশতকাল পেরিয়ে গেলেও যে সব খাতে চূড়ান্ত অব্যবস্হাপনা আর নৈরাজ্য চলে আসছে, তার মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ উল্লেখযোগ্য। সরকারের বাজেটে বরাদ্দ যথেষ্ট থাকে বলা যাবে না; তবে যতটা আছে, তা-ও যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যেত, তাহলেও অবস্হার উন্নতি ঘটত খানিকটা। ২০২১-২২ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের সীমাহীন দুর্নীতি আর উন্নয়নের উদ্যোগের অভাবে এ দেশের মানুষ যথেষ্ট সুচিকিৎসা পাচ্ছে না। আমাদের অনেক ভালো চিকিৎসক আছেন, কিন্তু তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্হা গড়ে তোলা হয়নি। মেডিক্যাল ঠিকাদারদের দৌরাত্ম্য, ওষুধ কোম্পানির বেপরোয়া বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি, বেসরকারি ক্লিনিকদের নৈরাজ্য, সরকারি চিকিৎসকদের দলবাজি, চিকিৎসা-প্রশাসকদের দুর্নীতি, সরকারি হাসপাতালের মেডিক্যাল স্টাফদের অদক্ষতা, অসততা আর অবহেলার কারণে সরকারি বাজেটও সঠিকভাবে কাজে লাগছে না। এসব অনাচার মিডিয়ার কল্যাণে এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। এগুলোর বাইরে গিয়েও গুটি কয়েক সরকারি হাসপাতাল হয়তো সুনাম অর্জন করতে পেরেছে কিছু দক্ষ চিকিৎসক আর প্রশাসকদের জন্য। কিন্তু তাদের সংখ্যা যেমন অল্প, তেমনি ভেতরে-বাইরে তাদের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র আর প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্হাকে অস্বাস্থ্যকর করতে পারলে তো অনেকেরই লাভ।
সমস্যা যা-ই থাকুক আর যতই প্রকট হোক, সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে চিকিৎসা খাতকে ঢেলে সাজানো। দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্সে নিয়ে দরকার সাড়াশি অভিযান চালানো। অদক্ষ রাজনৈতিক বা পেশাজীবী প্রশাসকদের সরিয়ে যদি দক্ষ, নিবেদিত চিকিৎসকদের দিয়ে হাসপাতালগুলো পরিচালনা করা যায়, তবেই পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে একই সঙ্গে চিকিৎসকদের দলীয় রাজনীতির মেরুকরণ থেকে দূরে সরানো প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়। দক্ষ, নির্দলীয় আর শক্ত প্রশাসক দিয়ে যে হাসপাতালের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা যায়, এমন দৃষ্টান্েতর জন্য বিদেশের দিকে তাকানোর দরকার নেই। দেশের সসস্ত্র বাহিনীর হাসপাতাল বা সিএমএইচগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে যে, কীভাবে হাসপাতালগুলো সুশৃঙ্খলার সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সর্বোপরি দরকার চিকিৎসকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস থেকে বিরত রাখা। দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় যে সরকারি চিকিৎসকদের বেতন হচ্ছে, তাদের তো প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার কথা নয়। এ দেশের বিচারক, সরকারি উকিল বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষকেরা বেশির ভাগই আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও তারা যেহেতু প্রাইভেট কোর্ট প্র্যাকটিস করতে পারেন না, তেমনি সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের জন্যও এমন নিয়ম চালু করা জরুরি। বিদেশে সরকারি আর বেসরকারি দুই ধরনের চিকিৎসক থাকেন। সেখানে সাধারণত সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার অনুমতি থাকে না।
এ দেশের মানুষের খুবই সাধারণ চাওয়া, যেন অন্তত চিকিৎসাসেবাটা জোটে সঠিকভাবে। বিভিন্নভাবে বঞ্চিত সাধারণ মানুষগুলো অন্যদের মতোই কয়টা দিন বেশি বাঁচতে চায়, তাই চায় সুচিকিৎসা বিনা মূল্যে অথবা স্বল্পমূল্যে। সেখানে যেন ব্যক্তির পরিচয় বা অর্থ-ক্ষমতা কোনো নিয়ামক হিসেবে কাজ না করে। এ দেশের স্বাধীনতা বেশির ভাগ খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিকদের আত্মত্যাগে অর্জিত। যাবতীয় সংগ্রামে, আন্দোলনে, সাধারণ মানুষই দিয়েছে প্রাণ। তাই দেশের সম্পদ আর সেবা দুটিতেই তাদের অগ্রাধিকার থাকার কথা। অথচ হিসাবটা হয়ে আছে উলটো। জীবন সাজাতে ও জীবন বাঁচাতে যাবতীয় সুবিধা যেন একশ্রেণির ক্ষমতাবান আর বিত্তবানদের জন্য তোলা আছে। সাধারণ মানুষের অবহেলায় আর অপচিকিৎসার দায় কেউ নেয় না। এমন বৈষম্যের আর নৈরাজ্যের চিকিৎসাব্যবস্হা কি আসলেই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারছে?
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন ও বিচার বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
