শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বাড়ছে চিকিত্সায় অবহেলাজনিত মৃত্যু, সমাধান কী?

আপডেট : ২৬ মে ২০২৪, ০৩:৫৪

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ। দেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনো কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। শহরের চেয়ে বেশি মানুষ যেমন গ্রামে বাস করে, ঠিক তেমনি তাদের রয়েছে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব। একদিকে রয়েছে রোগী ও রোগীর স্বজনদের স্বাস্থ্য অসচেতনতা অন্যদিকে রয়েছে চিকিত্সায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর মতো ঘটনা। এবং দেশে চিকিত্সায় অবহেলাজনিত (ভুল চিকিত্সা) কারণে মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

প্রতিদিনই রাজধানীসহ সারা দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে চিকিত্সায় অবহেলাজনিত কিংবা ভুল চিকিত্সার খবর আসছে। এমনকি মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়। গত এক বছর ধরে এমন মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটছে—যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সিনিয়র বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। তারা বলছেন, ‘অবশ্যই বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অপারেশন ও চিকিত্সাসেবায় ত্রুটি আছে এবং এর কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। নইলে দেশের চিকিত্সাসেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, রোগীরা বিদেশমুখী হয়েছে, আরো বেশি হবে। কতিপয় চিকিত্সক এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও অবহেলায় রোগীর মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়।’ এদিকে ভুল চিকিত্সায় অহরহ মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত টিম গঠন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অজ্ঞানকারী ওষুধের কারণ, চিকিত্সকদের গাফিলতি, নাকি অন্য কোনো কারণ তা অবশ্যই অনুসন্ধান করে বের করতে হবে।

বিদ্যমান জনবল, অবকাঠামো, চিকিত্সা সরঞ্জাম সব মিলিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিত্সাসেবা যেমন চালু রয়েছে, তেমনিভাবে বেসরকারি পর্যায়ের এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার মনোবৃত্তি থাকা বাধ্যতামূলক। মানসম্মত চিকিত্সা নিশ্চিত করাও জরুরি। সরকারের বিদ্যমান নিয়মনীতি মেনেই স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করতে হবে। যদি তা মান্য করা না হয় তাহলে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক অনুমোদন দেওয়ার কেন সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করছে কি না, আইসিইউ আছে কি না, গাইডলাইন অনুসরণ করছে কি না—তা নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিয়মিত বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। এটা হয় না বলেই ব্যাঙের ছাতার মতো যেখানে-সেখানে গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যদি সব ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে তারা অপারেশন করতে পারবে না। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে চিকিত্সায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর হার হ্রাস পাবে।

দেশে বর্তমানে বৈধ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চেয়ে অবৈধের সংখ্যা অনেক বেশি। সারা দেশে সরকারি হাসপাতালের আশপাশে লাখো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে, যার ৯৫ শতাংশ অবৈধ। যার অধিকাংশের মালিক স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা। একশ্রেণির ডাক্তার সরকারি হাসপাতালে ডিউটি না করে সেখানে কাজ করেন। সব মিলিয়ে সারা দেশে চিকিত্সাসেবায় চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। চিকিত্সাসেবার দুর্দশার পেছনে অযোগ্যতা, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি যেমন, তেমনি জনবলের ঘাটতিও কম দায়ী নয়। প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান নেই হাসপাতালগুলোতে। মফস্সলে পদায়ন হলেও যেতে চান না অনেকে।

বাংলাদেশে প্রায়ই ভুল চিকিত্সা বা অবহেলাজনিত কারণে রোগী মৃত্যুর অভিযোগ করেন স্বজনরা। তবে এই ভুল চিকিত্সার বিষয়ে মিডিয়া ট্রায়াল না করে গণমাধ্যম কর্মী ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে, যখন-তখন হাসপাতাল-ক্লিনিক ভাঙচুর, চিকিত্সকদের গায়ে হাত তোলা বন্ধ করতে হবে, সভ্য দেশে এগুলো চলতে পারে না। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৮০ এবং ৮৮ ধারাতে ‘সরল বিশ্বাসে পরিচালিত চিকিত্সাকার্যে’ সংঘটিত দুর্ঘটনার দায় থেকে চিকিত্সককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। চিকিত্সায় অবহেলাজনিত কারণে অভিযোগ করার একমাত্র জায়গা বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বা বিএমডিসি। এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান।

বিএমডিসির নিয়মানুযায়ী, কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তা অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে জবাব দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির উত্তর অভিযোগকারীকে জানানো হবে। তিনি তা গ্রহণ না করলে তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত চিকিত্সকের লাইসেন্স স্থগিত করার বিধান রয়েছে। এছাড়া ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন, ২০২৩’ নামে একটি আইনের খসড়া করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে, এটি এখনো আইনে পরিণত করা হয়নি। এর খসড়াতেও চিকিত্সায় অবহেলাজনিত কারণে রোগীর মৃত্যু হলে ফৌজদারি আইনে বিচার এবং আদালত কর্তৃক নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ আদায়ের কথা বলা হয়েছে। এতে, হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানের এবং চিকিত্সা প্রদানকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হাসপাতালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে লাইসেন্স বাতিল ও চিকিত্সকের ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশের কথা উল্লেখ আছে খসড়ায় এবং একই সঙ্গে এসব অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে চার ভাবে চিকিত্সায় অবহেলার প্রতিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফৌজদারি দায়বদ্ধতার অধীনে অবহেলা, দেওয়ানি দায়বদ্ধতার অধীনে অবহেলা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ভোক্তা সুরক্ষা আইনের অধীনে অবহেলা।

ভারতের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, অবহেলাজনিত কারণে রোগীর মৃত্যু হলে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষতিপূরণের জন্য যথাযথ সিভিল কোর্টে যাওয়ার বিধান রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের বিভিন্ন ধারায় ভুক্তভোগীকে ১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের মতোই ভারতে ‘ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিল’ রয়েছে ,যারা চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। চিকিত্সকদের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করতে পারে এই প্রতিষ্ঠান।

যুক্তরাজ্যে চিকিত্সকদের নিয়ন্ত্রণ করে ‘জেনারেল মেডিক্যাল কাউন্সিল’ এবং হাসপাতালগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে ‘কেয়ার কোয়ালিটি কমিশন’। দেশটিতে চিকিত্সায় অবহেলা হলে কঠোর আইনের বিধান রয়েছে। এটি ‘মেডিক্যাল ম্যানস্টার ল’ নামেই বেশি পরিচিত। আইনটি অনেক পুরোনো হলেও ২০১৮ সালে এটি সে দেশের পার্লামেন্ট রিভিউ করে। এ আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন কমিটি তদন্ত করে বড় ধরনের কোনো ভুল বা অবহেলা হয়েছে কি না। এটি প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিল এবং দুই থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

চিকিত্সায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর হার কমাতে এবং শতভাগ সুচিকিত্সা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃৃপক্ষের উচিত দেশের প্রতিটি হাসপাতালে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা, চিকিত্সকদের সব সুবিধা নিশ্চিত করে রোগীদের যথাযথ সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা। তবে আশার কথা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন মহোদয় বলেন, ‘সারা দেশে স্বাস্থ্যের কোথায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করব। ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যা যা করার করব। অপচিকিত্সার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের আস্থা ফিরে আসুক, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হোক, চিকিত্সায় অবহেলাজনিত মৃত্যুহার হ্রাস পাক—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক (নেফ্রোলজি), স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক ও আলোচক

 

ইত্তেফাক/এমএএম