বিজয়ের ৫০ বছরে বাংলাদেশ কৃষিতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও কৃষির সফলতা অনেক। একদিকে জনসংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে কৃষিজমি কমেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কৃষিকে করেছে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব উতরিয়ে দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ১৯৭২ সালে এ দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১০ মিলিয়ন টন। ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫.৪ মিলিয়ন টনে অর্থাত্ ৪ কোটি ৫৪ লাখ মেট্রিক টনে। এই ৫০ বছরে খাদ্যশস্যের গড় প্রবৃদ্ধির হার হলো প্রতি বছর ৩ শতাংশ। অন্যদিকে জনসংখ্যা বেড়েছে সাড়ে ৭ কোটি থেকে ১৭ কোটিতে। এ প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক ১.৯ শতাংশ। অর্থাৎ জনসংখ্যার চেয়ে খাদ্যশস্যের প্রবৃদ্ধির হার বেশি।
দেশ বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু কৃষির ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সবুজ বিপ্লবের আহ্বান জানিয়েছিলেন, যার স্লোগান ছিল ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’। তিনি বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) গ্রহণ করেন, যা ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই বাস্তবায়ন শুরু হয়। যুদ্ধবিধস্ত দেশ হওয়ার পরও ৫০০ কোটি টাকার প্রথম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্য থেকে ১০০ কোটি টাকা কৃষি খাতে বরাদ্দ দেন। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতেন স্বনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো উন্নত কৃষি।
ফলে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুণ। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। প্রযুক্তির প্রসারে বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে একই জমিতে দুটি বা তিনটি ফসল হচ্ছে। সরকারের যুগোপোযোগী কর্মপরিকল্পনা, পরিশ্রমী কৃষক এবং মেধাবী কৃষি বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদদের যৌথ প্রচেষ্টায় এ সাফল্য এসেছে।
২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, শ্রমশক্তির ৪০ দশমিক ৬২ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত অর্থাৎ কৃষি এখনো নিয়োগের বড় ক্ষেত্র। কৃষিকে কেন্দ্র করে অনেক উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে উঠেছে। কৃষি ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। গত ৫০ বছরে কৃষি অর্থনীতির কাঠামোগত বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ছোটবড় অনেক শিল্পের প্রসার ঘটছে। তবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পের প্রসার আরো বাড়ানো দরকার।
আগে আমাদের রপ্তানিযোগ্য পণ্য ছিল পাট, পাটজাত দ্রব্য, চা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। এখন অনেক কৃষিপণ্য রপ্তানির জায়গায় স্থান করে নিয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বার্ষিক খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি প্রতিবেদন ২০১৯ অনুযায়ী, স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে দেশের প্রধান প্রধান শস্য উৎপাদন তিন থেকে পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে দুই টন চাল উৎপাদন হতো। এখন হেক্টর প্রতি উৎপাদন হচ্ছে চার টনেরও বেশি।
ধান ধরে হিসাব করলে তা ছয় টন দাঁড়ায়। তাছাড়া হেক্টরপ্রতি ভুট্টা উৎপাদনে বিশ্বে গড় ৫ দশমিক ১২ টন। বাংলাদেশে এ হার ৬ দশমিক ৯৮ টন। খাদ্যশস্যে প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৩৪ টন উৎপাদন করে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পরে রয়েছে আর্জেন্টিনা, চীন ও ব্রাজিল। আর এভাবেই প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। বিগত সত্তরের দশকে দেশে খাদ্যশস্য আমাদানি করা হতো প্রতি বছর গড়ে ৩০ লাখ টন।
বর্তমানে জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যশস্যের গড় আমাদানি বাড়েনি বরং রপ্তানি বেড়েছে। বিশ্বের ১১৮টি দেশে বাংলাদেশ এখন ৫০ জাতের সবজি রপ্তানি করছে। চলতি বছর ২৩টি দেশে শুধু আম রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। সামনের বছরে লাখ টনের ওপরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় রপ্তানির সুযোগ বাড়বে বহু গুণ। কৃষকরা নতুন নতুন ফল উৎপাদনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী গত ১৫ বছর ধরে আমাদের দেশে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলচাষিদের আগ্রহের পাশাপাশি সরকারের নেওয়া সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে এ সাফল্য এসেছে। ১৯৭১-৭২ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২৮ শতাংশ, তা কমে এখন দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে।
তার পরও ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে অষ্টম, আম উত্পাদনে সপ্তম, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত পানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয় এবং ছাগলের মাংস উৎপাদনে চতুর্থ স্থান ধরে রেখেছে। গত ১৩ বছরে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের অন্তভুর্ক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৬৫৫টি উচ্চ ফলনশীল জাত এবং ৫৯১টি উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
দেশে বর্তমানে ৬০ ধরনের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে, যার সঙ্গে জড়িত ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার। গত এক যুগে শুধু সারেই ভতুর্কি দেওয়া হয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে এখন অনেক কম দামে কৃষক সার পাচ্ছে। পানি ও সেচের জন্য ব্যবহৃত বিদু্যতের ওপর চালু করা হয়েছে ২০ শতাংশ ভতুর্কি। বর্তমানে পানি সেচের আওতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট আবাদি জমির ৭০ শতাংশে। উচ্চ ফলনশীল ফসলের আওতায় এসেছে ৮৫ শতাংশ জমি। ফলে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে কৃষির সার্বিক উৎপাদন।
একসময় দেশীয় লঙ্গল ও পশুশক্তি দিয়ে চাষের ৯০ শতাংশই সম্পন্ন করা হতো। এখন পশুশক্তির ব্যবহার হ্রাস পেয়ে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে ৫০ শতাংশ ভতুর্কি মূল্যে এসব যন্ত্রপাতি। এছাড়া কৃষিক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন একটি নতুন সংযোজন।
কৃষির বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে কৃষক ও উদ্যোক্তা শ্রেণি লাভবান হচ্ছে। পণ্য বিক্রির অনেক সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কৃষকদের ন্যাঘ্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তার মধ্যে কৃষি বিপণন নীতিমালা ২০২১ প্রণয়ন অন্যতম। শিগ্গিরই কৃষক এর ফল ভোগ করবে বলে আশাবাদী। এভাবে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কৃষিই হবে এদেশের উন্নয়নের মূলভিত্তি!
লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ, সাবেক ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, এফএও; সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বারি)
