কেউ কাজ করছেন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে, কেউ দৃষ্টিশক্তিহীন ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে, আবার কেউ তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, সেবা ও শিক্ষার প্রসারে। অন্যদিকে কেউ চেষ্টা করছেন গেমিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষামূলক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ায়। তাদের একেক জনের গল্প একেক রকম। ভিন্ন ভিন্ন গল্পের এমন ১৫ তরুণ উদ্যোক্তা ও সংগঠনকে দেওয়া হয়েছে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০২১’।
২০ ডিসেম্বর সাভারের শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইন্সটিটিউটে তরুণদের পদচারণয় মুখর হয়ে ওঠে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চ। ‘তোমার জয়ে বাংলার জয়‘ স্লোগানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ৫টি ক্যাটাগরিতে বিশেষ অবদানের জন্য তরুণদের হাতে গড়া ১৫টি সংগঠনকে এ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। ক্যাটাগরিগুলো হলো— জলবায়ু পরিবর্তন ও উদ্ভাবন, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ, সামাজিক উন্নয়ন, সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং দক্ষতা ও কর্মসংস্থান। জনপ্রিয় এই অ্যাওয়ার্ডের জন্য সারাদেশ থেকে সাত শতাধিক আবেদন জমা পড়ে। সেখান থেকে যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া শেষে ৩১টি সংগঠনকে চূড়ান্ত পর্বের জন্য মনোনীত করা হয়। তাদের মধ্যে থেকে ১৫ তরুণ উদ্যোক্তা ও সংগঠনকে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়। বিজয়ীদের হাতে অ্যাওয়ার্ড হস্তান্তর করেন বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক।
বিজয়ী ১৫ তরুণ উদ্যোক্তা ও সংগঠন
স্টেপ এহেড: উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক কিশোরী-তরুণী ও নারীদের নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ‘স্টেপ এহেড’ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শাহানা আফরিন দিনা। সংগঠনটির মাধ্যমে বরিশাল অঞ্চলের এক হাজারের বেশি কিশোরী-তরুণী ও নারীদের সহায়তা করা হয়েছে।
টেক একাডেমি: গেমিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষামূলক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ায় লক্ষ্যে ২০১৩ সালে ‘টেক একাডেমি’ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শামস জাব্বার। সংগঠনটি ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের মাঝে গেমিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষামূলক তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ইকোভেশন বাংলাদেশ: ইকোভেশন বাংলাদেশ একটি গবেষণা ও উদ্ভাবন-ভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগ। ২০১৫ সালে সানজিদুল আলম সেবন শান এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্ভাবন-কেন্দ্রিক স্বেচ্ছাসেবী পদ্ধতির মাধ্যমে দেড় লাখ মানুষকে নিয়ে কাজ করেছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ প্রায় ৯০ হাজার মানুষকে বোতল বাতি, সোলার বোতল ল্যাম্প ও স্ট্রিটলাইট দিয়ে সাহায্য করেছে।
রিফ্লেক্টিভ টিনস: উদীয়মান তরুণদের সৃজনশীলতার বিকাশে কাজ করতে ২০১৩ সালে ‘রিফ্লেক্টিভ টিনস’ প্রতিষ্ঠা করেন ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব মুন্না। গত ৮ বছরে সংগঠনটি এক লাখের বেশি কিশোর-কিশোরীর সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য কাজ করেছে।
জেন ল্যাব: ২০১৫ সালে ‘জেনল্যাব’ প্রতিষ্ঠা করেন রাতুল দেব। মূলত শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সমাজের বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করছে সংগঠনটি। তারা পরামর্শ কার্যক্রমের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৩ লাখ মানুষের কাছে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক শান্তির কথা প্রচার করেছে।
দেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র: বাংলাদেশের ইতিহাসের বিকৃতি রোধে ঐতিহাসিক দলিলাদি সংগ্রহের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে ‘বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র’ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন গিরিধর দে। সংগঠনটি প্রায় ৭০ হাজার বিরল ছবি সংগ্রহ করেছে ও প্রচার করেছে।
বাংলাদেশ চা সম্প্রদায় ছাত্র যুব পরিষদ: চা শ্রমিকদের মধ্যে নানা সচেতনতামূলক প্রচারে জন্য ২০১৪ সালে ‘বাংলাদেশ চা সম্প্রদায় ছাত্র যুব পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করেন রিগান কুমার কানু। সংগঠনটি পিছিয়েপড়া ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল চা সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মাদক ও অ্যালকোহল সেবনের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে।
মেধাবী কল্যাণ সংস্থা: আর্থিক কারণে পড়াশোনা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১২ সালে ‘মেধাবী কল্যাণ সংস্থা-এমকেএস’ প্রতিষ্ঠা করেন মো. নুরুল আলম। সংগঠনটি এখন পর্যন্ত আর্থিক কারণে পড়াশোনা বঞ্চিত ৩৭৬ জন শিক্ষার্থীকে খাদ্য, বস্ত্র ও বৃত্তি প্রদান করেছে।
মনের স্কুল: তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ‘মনের স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন ফাইরুজ ফাইজাহ বেথার। সংগঠনটির পক্ষ থেকে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় কাউন্সেলিং করা হয়।
ট্রান্সএন্ড: তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিদের জীবনমানের উন্নয়ন এবং লিঙ্গ বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে কাজ করার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ‘ট্রান্সএন্ড’ প্রতিষ্ঠা করেন লামিয়া তানজিন তানহা। অলাভজনক এই সংগঠন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য, ক্ষমতায়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির জন্য কাজ করছে।
থার্ড আই: ‘শেয়ার দ্য রেসপনসিবলিটি’ স্লোগানে ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘থার্ড আই’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাশরুর ইশরাক এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিশক্তিহীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করছে।
ধ্রুবতারা যুব উন্নয়ন ফাউন্ডেশন: দেশে যুব ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে কাজ করার লক্ষ্যে ২০০০ সালে ‘ধ্রুবতারা যুব উন্নয়ন ফাউন্ডেশন (ডিওয়াইডিএফ) প্রতিষ্ঠা করেন অমিয় প্রপান চক্রবর্তী। সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবকরা দেশের ৪৪ জেলায় যুব উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে কাজ করছে।
অমল ফাউন্ডেশন: দেশের চরাঞ্চলে জীবিকা, স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষার প্রসারে কাজ করতে ২০১৪ সালে ‘অমল ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন এসরাত করিম। সংগঠনটি দেশের বিভিন্ন গ্রামের ৫২ হাজারের বেশি সুবিধাভোগী মানুষের মাঝে কাজ করেছে।
দিনের আলো হিজরা উন্নয়ন মহিলা সংস্থা: ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের উন্নয়নে কাজ করার লক্ষে ২০০২ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন আবু হাসান (জয়তা পলি)। সংগঠনটি হিজরা শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতে কাজ করছে এবং এ পর্যন্ত ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের প্রায় ৯০০ মানুষের মাঝে কাজ করেছে।
আসমানী যুব নারী ফাউন্ডেশন: কিশোরী ও তরুণীদের জন্য ২০১৬ সালে ‘আসমানী যুব নারী ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠাতা শিরিন আক্তার আশা নিজে বাল্যবিবাহ থেকে বেঁচে যাওয়ার পর এই সংগঠন গড়ে তোলেন। সংগঠনটি এ পর্যন্ত ২৯৪টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে।

