রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্যাডম্যানের গল্প!

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৩, ০৪:১৮

‘সময়টা করোনার মহামারিকালে; যখন গ্রামের বাড়িতে বসে মোবাইল নিয়েই বেশি সময় কাটানো হতো। অনেকটা হঠাৎ করেই নারীদের সুস্বাস্থ্য নিয়ে একটি ভিডিও সামনে এলো।  মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার নিয়ে নারীদের অসচেতনতার বিষয়টি সামনে এলো,  এমনকি গ্রামের নারীরা এ বিষয়ে একদম সচেতন না! যার ফলে জরায়ু ক্যান্সার থেকে শুরু করে নানা ধরনের অসুস্থতায় ভোগে তারা। এছাড়াও কিশোরীদের বয়ঃসন্ধির সময় নিয়েও গ্রামের অভিভাবকরা অসচেতন। এমন পরিস্থিতিতে মনে হলো কিছু একটা করা দরকার। যেহেতু আমরা ২০১৫ সাল থেকেই নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছি, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে  আমরা প্রতিবাদ করছি, নির্যাতনের শিকার নারীর পক্ষে আইনী লড়াই লড়ছি, তাই এবার নারীর সুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। সমাজে যে ট্যাবু আছে তা ভাঙতে হবে। নারীর মাসিকের আলোচনাকে উন্মুক্ত করতে হবে। এমন ধারণা থেকেই ইয়ুথ প্ল্যানেটের ‘গার্লস টক’ প্রকল্পের যাত্রা।’— কথাগুলো বলছিলেন ইয়ুথ প্ল্যানেটের প্রতিষ্ঠাতা এ বি এম মাহমুদুল হাসান (শিবলী)।

২০১৮ সালে Youth Planet (ইয়ুথ প্ল্যানেট)-এর যাত্রা শুরু। তারুণ্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের মাধ্যমে এসডিজি গোল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। মূলত নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করে লিঙ্গভিত্তিক সমতা নিশ্চিত ও নারীর সুস্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে গ্রামীণ নারী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলাদা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজ করছে সংগঠনটি।

এ বি এম মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘কিশোরীদের বয়ঃসন্ধি ও মাসিককালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে গ্রামীণ নারীদের মাঝে কাজ করছে ইয়ুথ প্ল্যানেট। বয়ঃসন্ধিকালে মা হিসেবে একজন নারী কী আচরণ তার মেয়ের সাথে করবে তা শিক্ষা দিচ্ছি। কারণ গ্রামের অধিকাংশ মা তার সন্তানের বয়ঃসন্ধিকাল সম্পর্কে অবগত নয়। তাছাড়া মাসিককালে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কেন প্যাড বা হাইজেন মেন্টেইন করে কাপড় ব্যবহার করতে হবে সে সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হচ্ছে। আমরা ‘গার্লস টক’ আয়োজনের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীর মাসিক সংক্রান্ত উন্মুক্ত আলোচনা করছি। সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে নারীরা উপস্থিত হচ্ছে সেই কর্মশালাতে। মাসিককালে বিভিন্ন খাবার বা চলাফেরা নিয়ে গ্রামে কুসংস্কার আছে আমরা তা দূর করতে কাজ করছি।

প্যাড বা রিইউজেবল প্যাডের উচ্চ মূল্যের কারণে অনেকে তা কিনতে পারে না। ফলে তা ব্যবহারও করে না। তাই আমরা নিজেদের প্যাড যেন নিজেরা তৈরি করতে পারে সেটা হাতে-কলমে শেখাচ্ছি; যেন নিজেদের সুস্বাস্থ্য নিজেরা রক্ষা করতে পারে। এছাড়াও সংগঠনের হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করে তারা সেই প্যাড সহজেই পাচ্ছে সংগঠনের ভলান্টিয়ারদের কাছ থেকে। ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল, নেত্রকোনার কেন্দুয়া ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে আমাদের কার্যক্রম চলমান।’  

তিনি বলেন, ‘স্কুল-কলেজের নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘গার্লস স্কোয়াড’ তৈরি আমাদের কার্যক্রমের আরেকটি দিক। কিশোরীদের আমরা বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে আলাদা প্রশিক্ষণ দেই এবং এলাকায় কোনো কিশোরীকে বাল্যবিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তারা তা আমাদের জানানো মাত্রই আমরা সেই বাল্যবিবাহ প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে আটকে দেই।

যুব উন্নয়নের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ইয়ুথ লিডারশিপ ট্রেনিং, নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। ইয়ুথ প্ল্যানেট’র স্টুডেন্ট উইংস হিসেবে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট’ নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে দেশব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছে।’ এ বি এম মাহমুদুল হাসান আরও বলেন, ‘কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবছর ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছি। এই স্বীকৃতি সামনের দিনে আমাদের কাজকে আরো গতিশীল ও সহজ করে তুলবে বলে মনে করি।’

ইত্তেফাক/এসটিএম