টিকা নিতে গিয়ে নানামুখী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। টিকাকেন্দ্রে গিয়ে প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের মুখে পড়তে হচ্ছে, পাশাপাশি দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। আবার কেউ কেউ কেন্দ্রে এসে ফিরেও যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতায় এমনটি হচ্ছে, যার খেসারত দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচিটি দেড় মাসের বেশি সময় আগে শুরু হলেও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি।
কেন্দ্র সংখ্যা কম হওয়ায় একটি কেন্দ্রে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীকে টিকা নেওয়ার জন্য যেতে হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের টিকা নেওয়ার খবরটি জানানো হয় ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায়। কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের এসএমএস দিয়ে জানান। কেউ এসএমএস পায়। কেউ পায় না। ফলে অনেকে প্রথম ডোজের টিকা নিতে পারছে না। এছাড়া যে কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে তাদেরও জানানো হয় ঠিক আগের দিন। ফলে প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও ঘাটতি ও সমন্বয়হীনতার দেখা যায়।
গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ কাকলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেওয়ার জন্য আসা শিক্ষার্থীদের নানা ভোগান্িত ও হয়রানির নানা চিত্র দেখা গেছে। গতকাল এই কেন্দ্রে রাজধানীর ১৫টি স্কুলের ৪ হাজার শিক্ষার্থীর টিকা নেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। অনেক শিক্ষার্থী তথ্য জানতে না পারায় টিকা কেন্দ্র আসেনি।
টিকা দেওয়ার জন্য অনেক দূর থেকে শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রে আসতে হয়েছে। এই কেন্দ্রে টিকা দেওয়ার জন্য আজিমপুর, লালবাগ ও হাজারীবাগের যে কলেজগুলো নির্ধারিত ছিল তার ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী টিকা দিতে আসতে পারেনি। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ টিকা দেওয়ার বিষয়টি জানতে পারেনি।
কাকলী উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ দীন মোহাম্মদ খান ইত্তেফাককে বলেন, ৪ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে গতকাল ১ হাজার শিক্ষার্থী টিকা নিতে আসেনি। যে ৩ হাজার শিক্ষার্থী ছিল তার অনেকের সঙ্গে তাদের বাবা-মা ছিল। ফলে কমবেশি ৮-৯ হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছিল কলেজ ক্যাম্পাসে। এ কারণে প্রচণ্ড ভিড় তৈরি হয়। যে কারণে অনেক সময় স্বাস্থ্যবিধি মানতে পারেনি শিক্ষার্থীরা।
প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে শিক্ষার্থীর পাশাপাশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে অভিভাবকরা। তারা জানান, একটি কলেজে এক দিনে কেন ৪ হাজার শিক্ষার্থীকে টিকা জন্য আসতে হবে। এতে তো ভিড় হবেই। স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন তো হবেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিকা গ্রহণের রেজিস্ট্রেশন জটিলতার কারণে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষার্থীরা টিকা কার্ড নিয়ে কেন্দ্রে গেলেই টিকা দিতে পারবে। এ কারণে অনেকে টিকা কার্ড পূরণ করে না আসার কারণে সমস্যা তৈরি হয়।
দীন মোহাম্মদ খান বলেন, টিকা দিতে বেশি সময় লাগে না। ১ মিনিটে ১০ জনের টিকা দেওয়া যায়। কিন্তু শিক্ষার্থী কেন্দ্রে এসে এই টিকা কার্ড পূরণ করায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকতে হয়। ফলে জটলা তৈরি হয়। টিকা গ্রহণের বিষয়ে নিজ কলেজ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা করা হয় না, এমন অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
অন্যদিকে এর আগে যারা প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছিল তাদের দ্বিতীয় ডোজের সম্ভাব্য তারিখ কার্ডে উল্লেখ থাকে। যাদের দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার জন্য ২২ ডিসেম্বর সম্ভাব্য সময় কার্ডে উল্লেখ ছিল তারাও গতকাল টিকা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়। কিন্তু গতকাল তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়নি। এ তথ্য শিক্ষার্থীদের না জানানোর কারণে গতকাল কয়েক শ শিক্ষার্থী কাকলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভিড় করে। পরে বিষয়টি জানতে পেরে তারা ফিরে যায়।
শিক্ষার্থীরা জানায়, দ্বিতীয় ডোজের তারিখ দেখে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছি। অনেক দূর থেকে এসেছি। কেন আমাদের জানানো হলো না যে, আজ দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কলেজের অধ্যক্ষ এজন্য দায়ী।
তথ্য অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ১২ বছর থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী এ টিকা নিতে পারছে। এই বয়সসীমার শিশুর সংখ্যা ১ কোটি এবং তাদের টিকার আওতায় আনার জন্য ২ কোটি ডোজ টিকার প্রয়োজন। সরকার এখন পর্যন্ত ১১ লাখ শিক্ষার্থীকে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দিয়েছে এবং ২ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকা কেন্দ্র হিসেবে রাজধানীর আটটি স্কুলকে নির্বাচন করা হয়েছে।
কেন্দ্রের দায়িত্ব থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি কেন্দ্র মনিটরিং করার জন্য শিক্ষা বিভাগের জন্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থাকলে তাদের দেখা যায় না।
তবে সিভিল সার্জন (ঢাকা) ডা. মইনুল আহসান বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো সমস্যা নেই। টিকা দেওয়ার সময় যেসব ব্যবস্থাপনা দরকার তা স্বাস্থ্য বিভাগ করছে। শিক্ষা বিভাগ করছে কি না, সেটা তাদের বিষয়। ভিড় এড়াতে টিকাকেন্দ্র বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না—এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, আপাতত কেন্দ্র বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। ছুটি থাকায় অনেকের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ নেই। এ কারণে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তবে কেন্দ্রগুলো শিক্ষা কর্মকর্তাদের মনিটরিং করার কথা। যদি ব্যত্যয় হয়, সে বিষয়ে তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান। শিক্ষার্থীদের বর্তমানে দ্বিতীয় ডোজের টিকাদান চলছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
