ভুলের লাইসেন্স

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০৮:৪৪

আমরা কথায় কথায় বলি, মানুষ মাত্রই ভুল হয়। হ্যাঁ, ভুল তো হয়ই। ভুল মানুষেরই হয়। অনেকে জোর দিয়ে বলে থাকেন, আমি কখনো ভুল করি না। সেটাও ভুল। কারণ, মানুষ মাত্রেরই ভুল হয়। সেটা জেনেবুঝেই হোক বা না জেনেই হোক। ভুল করে অনেকে পার পেয়ে যায়, আবার অনেককে বড় ধরনের মাশুল গুনতে হয়। আবার কিছু মানুষ আছে, যারা অন্যের ভুলের ফসল অনায়াসে নিজের ঘরে তুলতে ওস্তাদ। প্রকৃতির প্রতিশোধের কারণে আবার কখনো তাদের এই অন্যায়ের ফলও ভোগ করতে হয়। ভুল সবাই করে, দায়িত্ববান মানুষও করে। আমাদের দেশে দায়িত্ববান মানুষের যেন ভুলটা আরো বেশি বেশি হয়। কিন্তু এ দেশে কেউ ভুল স্বীকার করে না। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা নন, রাজনীতিবিদেরা নন, ব্যবসায়ীরা নন, এমনকি বুদ্ধিজীবীরাও নন। তাহলে কি এ দেশে কেউ ভুল করে না? কোথাও কারো কোনো অবহেলা, গাফিলতি, দায়িত্বহীনতা কিছু নেই?

কোনো ঘটনার পর কেউ বলে না : আমার ভুল হয়েছে, এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। কেউ যদি ভুল করে এবং ভুল করামাত্র তা স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নেয়, তাহলে কিন্তু মানুষ ক্ষমা করে দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চাওয়ার স্বভাব নেই বললেই চলে। সবাই আগে চেষ্টা করে নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে। নানাভাবে বোঝাতে যে, আসলে সেটা ভুল নয়। ভুল হলেও সেটা তার নয়। তবে ঠ্যালায় পড়ে অনেকে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায়। কিন্তু সেটা অনেক দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে মানুষের ক্ষোভ-রোষ সব সে অর্জন করে ফেলে।

কারো ভুল ধরিয়ে দিলে সে খুব একটা খুশি হয় বলে মনে হয় না। অনেকে ভুলকে ‘অধিকার’ ও ‘স্বাধীনতা’ মনে করে থাকে। অনেকে আবার ভুলের শৃঙ্খলকে অলংকার মনে করে। ‘ভুল-শুদ্ধের কোনো চিরন্তন মানদণ্ড নেই’—এমন বাণীও উচ্চারণ করে কেউ কেউ। এসবের ফাঁকফোকর দিয়ে ভুলের চর্চা এগিয়ে চলে।

আমরা সবচেয়ে বেশি ভুল করি বানানে। কারণ আমরা বানানের ব্যাপারে মনোযোগী নই। সবচেয়ে লজ্জার ব্যাপার হলো, আমরা আমাদের মাতৃভাষাটাও শুদ্ধভাবে লিখতে জানি না। এমনকি বেশির ভাগ মানুষ ভুল শব্দটাও শুদ্ধ করে না লিখে ‘ভূল’ লেখে। বাল্যকালে আমাদের বাংলার স্যার এক বন্ধু ‘ভূল’ লিখেছিল বলে বোর্ডে লিখেছিলেন : ‘ভুল বানান লিখিতে জীবনে কোনো দিন ভুল করিয়াও ভুল করিব না।’ এটা আমরা সবাই খাতায় ১০ বার লিখেছিলাম। এরপর থেকে ভুল লিখতে আর ভুল হয়নি।

কিন্তু আমরা প্রায়ই ভুলভাল শব্দ ব্যবহার করি, ভুল বানান লিখি। কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। স্বাস্হ্য, স্বাগত, স্বাগতম—এসব শব্দের মধ্যে ‘সু’ বা ভালো অর্থ নিহিত আছে। কাজেই এগুলোর আগে আরেকবার ‘সু’ লাগিয়ে সুস্বাস্হ্য, সুস্বাগত বা সুস্বাগতম করা বাহুল্যজনিত অশুদ্ধি। কিন্তু আমরা আপসহীন! এই করোনাকালে কত আন্তরিকতার সঙ্গে সবার ‘সুস্বাস্হ্য’ কামনা করে যাই। আমাদের ঠেকায় কে?

‘কেবলমাত্র’, ‘শুধুমাত্র’ তেমনই একটি ভুল। এটা দ্বিত্ব দোষে দুষ্ট। ‘কেবল’ বা ‘মাত্র’ বললেই হয়, কিন্তু আমরা কেন জানি যুগ যুগ ধরে ‘কেবলমাত্র’ বলটাকেই অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছি। আমি নিজে একবার একজনের লেখায় ‘শুধুমাত্র’ কেটে ‘শুধু’ করাতে বিড়ম্বনায় পড়েছি। আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে তিনি বলেছেন, পলিটিক্যাল সায়েন্সে পড়েই এত পণ্ডিতি। বাংলা পড়লে তো নিজেকে বিদ্যাসাগর মনে করত!

আসলে অভ্যাসের বাইরে কেউ যেতে চায় না! ভুল ধরিয়ে দিলে উলটো চ্যালেঞ্জ করে।

কারো মৃতু্যর পর শোকবার্তায় প্রায়ই বলা হয়, তার ‘বিদেহী’ আত্মার কল্যাণ কামনা করি। ‘বিদেহী’ একটি অশুদ্ধ শব্দ। ‘বিদেহ’ শব্দের অর্থ দেহশূন্য বা অশরীরী। বিদেহ শব্দটিই বিশেষণ, কাজেই এর শেষে ঈ-প্রত্যয় যোগে পুনরায় বিশেষণ করা ভুল। ‘উল্লেখিত’ শব্দটি ব্যাকরণসিদ্ধ নয়। অভিধানেও নেই। শুদ্ধ হলো ‘উল্লিখিত’। শব্দটি সন্ধির নিয়মে গঠিত (উল্লিখিত = উত্ + লিখিত)। কিন্তু তার পরও মনের আনন্দে আমরা ‘উল্লেখিত’ লিখে যাই!

আমরা ‘দারিদ্রতার কষাঘাতে’ লিখতেই অভ্যস্ত। যতই বলেন ‘দারিদ্র্য’ বা ‘দরিদ্রতা’ লিখতে, মানতে চায় না কেউ।

পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা অনেক ভুল করি, যেমন—‘উত্কর্ষ’কে ‘উত্কর্ষতা’, ‘সখ্য’কে ‘সখ্যতা’, ‘সৌজন্য’কে ‘সৌজন্যতা’ লিখি। বাহ্যিক (বাহ্য), মহারাজা (মহারাজ), অর্ধরাত্রি (অর্ধরাত্র), মাধুর্যতা (মাধুর্য), মৌনতা (মৌন), কনিষ্ঠতম (কনিষ্ঠ), আবশ্যকীয় (আবশ্যক), অপমান হওয়া (অপমানিত হওয়া), প্রবেশ নিষেধ (প্রবেশ নিষিদ্ধ) ইত্যাদি (ব্র্যাকেটের ভেতরে ঠিক শব্দটি দেওয়া হয়েছে)।

ভুলের ব্যাপারে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হলো, অনেকেই এগুলো মানতে চান না। অনেকে চটে গিয়ে বলেন :ব্যাটা বেশি বুঝিস? আমি ‘প্রবেশ নিষেধ’ লিখব, পারলে তুই আমাকে নিষিদ্ধ কর!

যদিও এটা কোনো সংগত আচরণ নয়। ভুল স্বীকার করতে হবে। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ঠিক পথে যেতে হবে। শুদ্ধ শব্দটা ঠিক বানানে লিখতে হবে। এতে লজ্জা নেই।

ভুলের ব্যাপারে একটি মহাজন বাণী উল্লেখ করা যেতে পারে।

“মানুষ ভুল করে শেখে, পরে সে ভুল সংশোধন করেই সত্যের সন্ধান পায়। সাধারণের ধারণা, ‘ঠেকে শেখার চেয়ে দেখে শেখাই’ বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু ‘অতি বুদ্ধির গলায় দড়ি’ বলেও একটা কথা আছে। নিরুদ্বেগ আপদহীনতার ভেতরেই অনেক সময় বিপদের বীজ প্রচ্ছন্ন থাকে। আসল কথা, জীবনের অভিজ্ঞতা ও গভীর অনুভূতিলব্ধ যে জ্ঞান ও শিক্ষা, বাস্তবিকই তার তুলনা নেই। স্বল্প পরিসর টবের ভেতর জীবন ধারণ করার চেয়ে, বাইরের বিস্তৃতির ভেতরে আনন্দে বিকশিত হওয়া অনেক বেশি স্বাস্হ্যকর। তবে অন্যের দুর্দশা দেখেও অবশ্যই শিক্ষা লাভ করতে হবে। কারণ এক জনের পক্ষে সব ধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করা অসম্ভব। আমাদের এই বর্তমান কোটি কোটি অভিজ্ঞতারই ফল, সুতরাং জীবনযাত্রায় অন্যের অভিজ্ঞতারও যে প্রয়োজন আছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যের কাছ থেকে পাওয়া অসম্পূর্ণ বা অপরীক্ষিত জ্ঞানকে নিজের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচাই করে নিজস্ব করে নিতে হবে। স্বাস্হ্য ও পরিপুষ্ট জীবনের এই-ই ধারা।

বাস্তবিক ভুল আছে বলেই পৃথিবীটা এত সুন্দর। ভুল না থাকলে পৃথিবীর দয়া, মায়া, ক্ষমা, ভালোবাসা প্রভৃতি কোমল গুণের এত অবকাশ ও বিকাশ হতো কি না, সন্দেহ। তাছাড়া ভুল না থাকলে এত দিন মানুষের সমস্ত প্রচেষ্টা ও অগ্রগতি কবে রুদ্ধ হয়ে সমস্ত অসাড় হয়ে যেত।

এখানেই ভুলের মূল্য।”

তবু ভুল নাহি মানে, মানে পরাভব। ভুল বানান, ভুল শব্দ, শুরুতে, মধ্যে বা শেষে শব্দ হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা এখনো ঘটে।

এ ব্যাপারে দুটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

বহু বছর আগে একবার এক পত্রিকায় একটি খবর বেরিয়েছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘পুলিশের গু খেয়ে বকের মৃতু্য’। এই খবর পড়ে পাঠকের তো চোখ ছানাবড়া। পুলিশের গু খেয়ে বকের মৃতু্য হয় কীভাবে? আর বক মাছ বাদ দিয়ে পুলিশের গু খেতে যাবে কেন? মাছের আকাল বলে কি বক এখন গু-মুত খাওয়া শুরু করেছে? আর পুলিশের গু কেন খেতে হবে? আর ঐ জিনিসে এমন কী আছে যে বক মরে যাবে?

ভুল ভাঙল পরের দিন।

পরদিন ঐ পত্রিকায় লিখেছে : আমরা দুঃখিত, গতকালের শিরোনামটি ভুল ছিল। আসলে শিরোনামটি হবে : ‘পুলিশের গুলি খেয়ে যুবকের মৃতু্য’।

যাই হোক, ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সংশোধনীর শেষে তারা লিখল,

বি:দ্র: গতকাল গু এবং বকের ক্ষেত্রে আমাদের পাছার ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত!

পাছার ভুল হয় কীভাবে? আসলে এখানেও ভুল হয়েছে। ওটা আসলে ‘পাছা’ না, হবে ‘ছাপা’!

একবার পাবলিক লাইব্রেরির সামনে বিলবোর্ডে একটা স্লোগান দেখেছিলাম : ‘প্রিয়জনকে বেশি করে বউ উপহার দিন।’ ‘বই’-এর জায়গায় ‘বউ’ লিখে পুরো স্লোগানটাকেই হাস্যকর বানিয়ে ফেলা হয়েছিল! এমন ভুল প্রায়ই চোখে পড়ে। বছর কয়েক আগে এক পত্রিকায় লিখেছিল, ‘ঈদে নারীর টানে ঘরমুখো মানুষের ভিড়।’ ‘নারী’র টান আর ‘নাড়ি’র টানের পার্থক্য পত্রিকাটি যেমন বোঝেনি, ঐ পত্রিকার পাঠকেরাও বুঝেছে বলে মনে হয় না!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন