সবকিছু কেনা সম্ভব হলেও, সময় কেনা বা বেচা এখনো সম্ভব নয়। তবে অচিরেই শুরু হবে সময় কেনাবেচা। অন্তত এমনটাই আশা করছেন বিশ্বখ্যাত আমাজানের প্রতিষ্ঠাতা ধনকুবের জেফ বেজোস। শুধু জেফ বেজোস একাই নন, বিশ্বের আরো কিছু অতিমাত্রায় ধনী ব্যক্তিরা উঠেপড়ে লেগেছেন। কারণ তাদের সাধ কখনোই তাদের সাধ্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। এমন কিছুই নেই যে তারা কিনতে পারেন না। শুধু সময় ছাড়া! সময় রয়ে গেছে আজও অধরা।
অনেকেই মানুষের মাত্র কয়েক দশকের জীবনকে মেনে নিতে পারছেন না। তাদের মতে, জন্ম স্বাভাবিক হলেও, মৃতু্য মোটেই স্বাভাবিক নয়। আর বার্ধক্য হচ্ছে একটি রোগ। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মানুষের গড় আয়ু খুব কমই ৫০-এর ঘর ছুঁয়েছে। অথচ ১০০ বছরের ব্যবধানে উন্নত জীবনমান তথা বিজ্ঞানের কল্যাণে গড় আয়ু ৭৫ ছাড়িয়ে গেছে। একবিংশ শতক পার না হতেই মানুষের গড় আয়ু পুরুষেরা ৭৫ ছুঁইছঁুই করলেও নারীরা ৮০-র ঘরে পা রাখতে শুরু করেছেন। আর যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের বয়স ৯৫ বছর ছাড়িয়ে গেলেও দিব্যি রাজকীয় কাজকর্ম করে যাচ্ছেন। এখন খানিকটা খোঁজখবর করলে শতবর্ষী মানুষ খুঁজে পাওয়া মোটেই দুষ্কর নয়। আর এ পর্যন্ত যিনি দীর্ঘ জীবনের রেকর্ড করেছেন, তিনি হলেন একজন মানবী, ফরাসি নাগরিক, নাম জ্যাঁন ক্যালমোন। ২১ ফেব্র‚য়ারি ১৮৭৫ তারিখে প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন। আর সেই আলো নিভে গিয়েছিল ৪ আগস্ট ১৯৯৭ তারিখে। গুনে গুনে পালন করেছিলেন ১২২তম জন্মবার্ষিকী। আশা করা যাচ্ছে যে, আগামী পাঁচ দশকে মানুষের গড় আয়ু এমনিতেই ১২৫ বছর হবে।
মৃতু্যকে জয় করা বা অমরত্ব লাভ না হোক, চির যৌবন বা আয়ু তিন, চার, পাঁচ গুণ অথবা আরো অনেক বেশি বৃদ্ধি করা মোটেই এখন আর অলীক বা কষ্টকল্পনা নয়। আর এই অসম্ভব আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দিয়েছে সাম্প্রতিক কিছু আবিষ্কার, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অগ্রগতি। এর মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখ করা যায় মানুষের শারীরবৃত্তীয় বা জৈবিক বয়স হিসাব করতে ‘এপিজেনেটিক ঘড়ি’র ব্যবহার। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্হিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বংশগতিবিদ স্টিভ হরভাট এমন যুগান্তকারী গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষের জৈবিক বয়সের গতি উলটো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব। আর ২০০৬ সালে, কিয়োটো ইউনিভার্সিটির শিনিয়া ইয়ামানাকা চারটি বিস্ময়কর প্রোটিন (ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস) শনাক্ত করে চমকে দিয়েছিলেন বিশ্বের জীববিজ্ঞানীদের। নবযৌবন লাভের রহস্যে সহসাই ধরা দেয়, মানুষ জানতে পারে কী করে, কীভাবে ‘প্ল‚রিপোটেন্ট স্টেম সেল’ নিজে থেকেই ত্রুটিপূর্ণ, জরাগ্রস্ত কোষগুলোকে সারিয়ে পুনরায় নবীন হয়। এ যেন সেই পৌরাণিক কাহিনিতে উল্লেখ করা সরোবরের মতো। যে সরোবরে অবগাহন করলে অশীতিপর ব্যক্তিটি মুহূর্তে ১৮-২০ বছরের টগবগে যৌবনে উদীপ্ত হয়। এমন আবিষ্কারের কারণে শিনিয়া ইয়ামানাকা রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান, তাকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।
এদিকে কোবিড-১৯ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েও বিজ্ঞানীরা বয়স্ক এবং দুর্বল কোষকে সারিয়ে দ্বিতীয় জীবন দেবার উপায় খুঁজে পাবার দ্বার প্রান্েত পৌঁছে গেছেন। আশা করছেন, ঘাতক ব্যাধি ক্যানসারকে জয় করার সুখবর দেবেন অচিরেই। একাধারে চার দশক চেষ্টার পর, এইডসের টিকাও এখন প্রায়ই হাতের মুঠোয়। আরো আছে প্রায় নিখুঁত, উচ্চ কর্মক্ষমতাসম্পন্ন এবং টেকসই কৃত্রিম অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোতে ফ্রান্সের ‘কারমা’ নামক প্রতিষ্ঠানের তৈরি কৃত্রিম হূত্পিণ্ডের বাণিজ্যিক উত্পাদন এবং মানবদেহে প্রতিস্হাপন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মধুমেহ বা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সুখবর, কৃত্রিম অগ্ন্যাশয় যুক্তরাজ্যে অনুমোদন পেয়েছে। অচিরেই কিনতে পাওয়া যাবে কৃত্রিম বৃক্ক বা কিডনি এবং অগ্ন্যাশয়। এদিকে নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞানেরও কম অগ্রগতি হয়নি।
তাই এবার সময়কে নিয়ন্ত্রণ করার সময় এসেছে। অনেকেই মনে করছেন তা খুবই সম্ভব। আর সে উদ্দেশ্যেই কাঁড়ি কাঁড়ি কড়ি লগ্নি করা হয়েছে ইতিমধ্যে। তারা মাত্র কয়েক দশকের মানুষের জীবনকে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তারা বলছেন, বার্ধক্য একটি অসুখ। এর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করতেই তাদের এই প্রচেষ্টা। আগামী দিনে মানুষ সুস্বাস্হ্য নিয়ে বেঁচে থাকবে ২০০, ৩০০ এমনকি ১০০০ বছর। অনেকগুলো স্টার্ট-আপ খুব আটঘাট বেঁধে লেগেছে। স্টার্ট-আপগুলো উচ্চ মাসোহারায় বিশ্বের নামকরা সব জৈবপ্রযুক্তিবিদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত অমৃতের সন্ধানে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির এল্টস ল্যাবস। এখানে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীরা জড়ো হয়েছেন। সবার একটি উদ্দেশ্য—অমরত্ব বা চিরযৌবন লাভের উপায় খুঁজে বের করা। আর এমন অসাধ্য সাধন করতে গবেষণার অর্থের একটি বড় অংশের জোগান দিচ্ছেন জেফ বেজোস এবং রাশিয়ান বংশোদ্ভূত কোটিপতি ইউরি মিলনার। দীর্ঘজীবন ও চিরতারুণ্য লাভের গবেষণাকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ২০১৩-তে গুগল ‘ক্যালিফোর্নিয়া লাইফ কোম্পানি’ সংক্ষেপে ‘ক্যালিকো’ নামে একটি গবেষণা ইউনিট স্হাপন করেছে। এদিকেও রাজকীয় আশীর্বাদে সৌদি আরবে পেপসিকোর বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক প্রধান মেহমুদ খান প্রতিষ্ঠা করেছেন হেভলুশন ফাউন্ডেশন। একই লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে কাজ করে যাচ্ছে লংজিভিটি সায়েন্স ফাউন্ডেশন। সে যা-ই হোক, বোদ্ধা বিজ্ঞানীরা অমরত্বকে হাতের মুঠোয় না নিতে পারলেও দৃঢ়ভাবে আশা করছেন যে দীর্ঘজীবন ও চিরতারুণ্য এখন প্রায়ই মানুষের নাগালের মধ্যে অর্থাত্ সময় কেনা এখন মাত্র সময়ের ব্যাপার।
তবে সমাজবিজ্ঞানীরা এমন খবরে তেমন খুশি হতে পারছেন না। কারণ দীর্ঘজীবন যদি কয়েক শতক হয়, তবে মানুষের আচার-আচরণের আমূল পরিবর্তন ঘটবে। জীবনের একঘেয়েমি মানুষকে বিভিন্ন বিকৃত কাজকর্মে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। হতাশার মতন চরম মনোবৈকল্য স্হায়ী হতে পারে। ফলে অতিমাত্রায় মানুষকে আত্মহননে প্ররোচিত করতেও পারে। তাছাড়া বিভিন্ন প্রজন্মের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে? ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে কয়েক দশকের জায়গায় কয়েক শতাব্দী একসঙ্গে থাকা সম্ভব হবে কি? এমন প্রশ্নও তারা তুলছেন। আমাদের এই ক্ষুদ্র গ্রহে জনসংখ্যার বিষয়টি বা বাদ যাবে কেন?
এমন সব প্রশ্নের উত্তরে, স্বপ্নবাজদের জুতসই উত্তর আগে থেকেই তৈরি করা আছে। আর তা হলো বিজ্ঞান মানুষকে নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি করবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষই পারবে তার সমাধান করতে। এখন তাই একটাই প্রশ্ন—তা হলো ‘সময়’ কেনার সময় হয়েছে কি?
লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক
