২০২০ সালের ২৮ মে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের খিলগাঁও কার্যালয়ের জন্য বিশেষ কোনো দিন ছিল না। প্রতিদিনের মতো রান্নাঘরে সবাই ব্যস্ত দুপুরের খাবার তৈরিতে। খাবার তৈরি প্রায় শেষ। কেউ কেউ খাবার খেতে প্লেটও নিয়ে নিয়েছেন।
রান্নাঘরের বাইরে হঠাৎ কিছুটা অন্য পরিবেশ। পাজেরো গাড়ির উপস্থিতি ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে। গাড়ির সামনে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। তাই বিস্ময়ের সীমা নেই স্বেচ্ছাসেবক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলা গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি চলে গেলেন রান্নাঘরে। এই ভদ্রমহিলা হচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। নিজের উপার্জনের কিছু অর্থ অনাথ শিশুদের দিতে কাউকে না জানিয়ে তিনি এসেছিলেন এখানে।
এমন ঘটনা হয়তো অনেকের কাছেই খটকা লাগছে। লাগারই কথা। কারণ এই সংবাদ ভাইরাল হয়নি। এমন ইতিবাচক সংবাদ আমরা ছড়িয়ে দিই না। তাই সমাজে যখন মনখারাপ করার মতো সংবাদ হয়, তখন সেই দায় কিন্তু কিছুটা আমাদেরও।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের নেতিবাচক সংবাদ গণমাধ্যমে হয়েছে সংবাদ, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়েছে নেতিবাচক, মিথ্যা, কুরুচিপূর্ণ বিশ্লেষণ। আর সেগুলো ভাইরাল হয়েছে। ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সব জায়গায়। এই ইস্যুতে কেউ কেউ রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেও ছাড়েননি। আপনি চিরকাল গোলাম হয়ে থাকবেন, তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবেন—কোনো সমস্যা নেই। সমস্যাটা এক জায়গাতেই, আপনি কেন আত্মমর্যাদা নিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করবেন?
মাস ছয়েক আগে বরগুনা জেলার বেতাগীতে হঠাৎ করে দেখা দিল ডায়রিয়া। উপজেলা সদরের যেখানে হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা কম, সেখানে বারান্দা এমনকি হাসপাতালের রাস্তাতেও রোগী। বাড়তি আয়ের জন্য পুরো জেলাসদর হয়ে গেল স্যালাইন শূন্য। হাতে পাইপ দিয়ে লাগানো স্যালাইনের দাম উঠল হাজার টাকা পর্যন্ত। যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড়। খবর পেয়ে ঐ এলাকারই ছেলে স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খান মো. রেজাউল করিম নিজস্ব চেষ্টায় এক দিনের মধ্যেই সরবরাহ করলেন কয়েক লাখ স্যালাইন। বিনা মূল্যে সেই স্যালাইন দেওয়া হলো মানুষদের। সেই সংবাদ ভাইরাল হলো না।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানকে ফোন করে একটা অভিযোগ জানালাম কয়েক সপ্তাহ আগে। গুরুতর অভিযোগ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের গেটের সামনে সরকারের উন্নয়ন বোঝাতে একটা ছবি লাগানো হয়েছে, যেখানে সব বাচ্চাদের হাতে বই। খুবই ভালো ছবি সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, ছবিতে যে বাচ্চাটি সবার আগে তার হাতে একটা গাইড বই। মন্ত্রীকে জানানোর পরের দিনই ছবিটা পরিবর্তন করে প্রাথমিকের পাঠ্য পুস্তকের ছবি দেওয়া হলো। তিনি আমাকে সেই তথ্যও জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে শিক্ষার মান নিয়ে নানা সমালোচনা হয়। আমরাও সেই সমালোচনায় যোগ দিই। প্রতি বছর কত জন ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেল, কত জন প্রাথমিকের গণ্ডি পার হতো পারল না, এ নিয়ে সারা বছরই গণমাধ্যমে নানা সংবাদ হয়। বিদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কেমন—এটা খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করি ২০২০ সালের শেষ দিকে। ঐ বছরই ক্যামব্রিজে ভর্তির সুযোগ হয়েছে বাংলাদেশি মেধাবী শিক্ষার্থী বুশরা আরাবীর। ও জানাল বিশ্বের সেরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছরই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে যতটুকু তথ্য আছে তাও মিলে গেল বুশরার সঙ্গে। গর্বটা আরো বেড়ে গেল।
ঢাকার আশপাশে ১০টি স্কুল প্রকল্প নিয়ে মহাদুর্নীতি হয়েছে। কলাগাছ বিক্রি হয়েছে কোটি টাকা দামে। এমন সংবাদ এসেছে গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। অথচ তদন্ত কমিটি যখন তাদের প্রতিবেদনে জানাল, দুর্নীতি হয়নি। প্রমাণ মেলেনি। কারণ অর্থ ছাড় হয়নি—তাই দুর্নীতির সুযোগ নেই। সে সংবাদ আমরা ছড়িয়ে দিইনি।
যশোর এম এম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মোস্তফা কামাল। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে মারা যায় তার চার বছরের ছোট্ট শিশু আব্দুর রহমান। আব্দুর রহমান চলে যাওয়ার পর থেকে শিক্ষক মোস্তফা কামালের মনে হলো হাসপাতালগুলোতে শিশু ওয়ার্ডে আসলে শিশুবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। আব্দুর রহমানকে নিয়ে যেদিন প্রথম হাসপাতালে ভর্তি হলো, সেদিন দেখল তার বাথরুম করার জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেই। যা-ই হোক, আব্দুর রহমানের মৃত্যুর পর নিজের আর স্ত্রী শিক্ষক নাহিদা শর্মিলার সঞ্চিত অর্থ দিয়ে প্রায় সবগুলো সরকারি হাসপাতালে গড়ে তুললেন শিশু কর্নার। প্রতিটি শিশুর জন্য কিনে দিলেন দামি দামি খেলনা। ছড়িয়ে দিতে পারেনি শিক্ষক মোস্তফা কামাল দম্পতির শিশুদের জন্য এমন এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
একটি অসহায় পরিবারের এক সদস্যের বিয়ে হবে—লাখ তো দূরের কথা অন্যের সাহায্য ছাড়া ১০০ টাকাও খরচ করার সামর্থ্য নেই তাদের। ব্যবসায়ী আব্দুর রশিদ মজুমদারকে জানালাম পুরো বিষয়টি। অসহায় ঐ পরিবারের কাছে যে অর্থ তিনি পাঠালেন, তা ঐ পরিবারটি কখনো গুনেই দেখেনি। এই সংবাদগুলো তো আমরা কেউ ভাইরাল করি না। কেউ লিখিও না। পত্রিকার চিঠিপত্রের যে কলাম সেখানেও নানা সমালোচনা, না পাওয়ার বেদনা লিখে থাকেন হাজারো মানুষ। কিন্তু এসব ঘটনাও তো ঘটে, সেগুলো মানুষ জানলে তো মনটা ভালো হয়। এমন হাজারো ঘটনার বর্ণনা আছে আমাদের সমাজের অনেকের কাছে।
সম্প্রতি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ‘আজ আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে, যা বাকি বিশ্বের জন্য এক অনুপ্রেরণা। ভাবা যায়, কত বড় কথা। দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে আয়োজিত ‘বিজয়পর্ব’ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাজারো মানুষের সামনে এমন মন্তব্য করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা গণমাধ্যমে মোটা দাগে এগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়নি। আসুন, এমন ইতিবাচক সংবাদ আমরা ভাইরাল করি। ছড়িয়ে দিই। কোন ঘটনা গ্রহণ করব আর করব না—এটা বোঝার উন্নত মানসিকতা তৈরিও কিন্তু একটা দেশের জন্য জরুরি। এ বোধ যদি তৈরি করা না যায়, অর্থাৎ ইতিবাচক মনমানসিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি না হলে যে-কারোর যে কোনো সময় এর শিকার হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পুরো সমাজ, এমনকি দেশও।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ এডুকেশন রিপোর্টার্স ফোরাম
