ঐতিহ্যের ইত্তেফাকে ফুটে উঠুক জনতার প্রতিচ্ছবি 

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০৩:১১

’৫৪-এর সাধারণ নির্বাচন থেকে ঐতিহাসিক ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, নিপীড়িত বাঙালির রুদ্ধদ্বার দীর্ঘশ্বাস থেকে মুক্তিযুদ্ধ, সেনা শাসন থেকে গণতন্ত্র মুক্তির আন্দোলন। মোটকথা স্বাধীন বাঙালি জাতির পুনর্জন্মের সাক্ষী ইত্তেফাক। শোষিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণের প্রতিফলক হিসেবে সমাজের বিবেকে যুগে যুগে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নাড়া দিয়েছে এ দৈনিক পত্রিকাটি।

যেমন দেশভাগ-পরবর্তী সময়কালে পশ্চিম পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর যেসব নির্যাতন ও বৈষম্য করা হতো, সেসব সংবাদ নিয়মিত প্রকাশ করা হতো পত্রিকাটিতে। ফলশ্রুতিতে ব্যাপক গণজাগরণের মধ্যে দিয়ে ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয় অর্জন করেছিল বলে মত দেন অনেক ঐতিহাসিক।

আবার বিভিন্ন সময়ে এ ভূখণ্ডে জারি হওয়া সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও পত্রিকাটি তার জনবান্ধব নীতিকে সমুন্নত রেখেছিল। উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে আইয়ুব খানের জারি করা সামরিক শাসনের সমালোচনা করে বিভিন্ন কলাম লেখায় গ্রেফতার হয়েছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।

পরবর্তীতে হিন্দুদের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য পত্রিকাটির মাধ্যমে ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শীর্ষক আহ্বান, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুখপত্র হিসেবে কাজ করা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করার মাধ্যমে দৈনিক ইত্তেফাক চোখে চোখ রেখে জবাব দিয়েছিল শোষকের চোখ রাঙানিকে। 

সে কারণে ইত্তেফাকে প্রকাশিত কোনো সংবাদ সমাজে সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত নিয়মের বিরুদ্ধে যাচ্ছে কি না, প্রকাশ করা ধারণাগুলো শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে ক্ষতিকর মনোভাবের জন্য অবদান রাখছে কি না, লেখার কোনো অংশ কোনো ধর্মীয় বিতর্ককে উসকে দিয়ে সমাজকে অস্হিতিশীল করে তুলছে কি না, সেসব বিষয়গুলো ঐতিহ্যর ইত্তেফাকে কঠোরভাবে মানা উচিত।

এছাড়া সংবাদে প্রকাশিত ধারণাগুলো আইনি বিধানের বিরোধিতা করছে কি না, কোনো ব্যক্তির চিন্তাভাবনা, ধারণাগুলো কুসংস্কারকে জাগিয়ে তুলছে কি না এবং সংবাদে উদ্ধৃত ডেটা এবং পরিসংখ্যানগুলো সঠিক কি না তা ক্রস-চেকিং বরাবরের মতো ইত্তেফাকে করা হবে বলে বিশ্বাস করে পত্রিকাটির পাঠকসমাজ। 

বর্তমানে অনেক সংবাদপত্রে প্রকাশিত মন্তব্য একটি পক্ষপাতমূলক মানসিক অবস্থা থেকে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে। এর ফলে যেসব পত্রিকা কঠোরভাবে সাংবাদিকতার নীতিকে মেনে চলে, তাদের ওপর থেকেও মানুষ আস্থা হারাচ্ছেন। 

বিদেশি মিডিয়াগুলোর ওপর বা দেশে পরিচালিত বিদেশি মিডিয়ার ওপর মানুষ এই আস্থাহীনতার কারণেই বেশি ঝুঁকছে। পরিস্থিতি এমন যে, কোনো একটি বিষয়ে দেশীয় সংবাদপত্রগুলো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করলে এবং একটি বিদেশি মিডিয়া মিসইনফরমেশন সরবরাহ করলেও মানুষ বিদেশি মিডিয়াকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের স্টান্ডার্ড ধরে নিচ্ছে।

আবার দেশে সংবাদপত্র, নিউজ নেটওয়ার্ক এবং ক্যাবল নিউজ চ্যানেলগুলো ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে পাঠকসমাজ তথ্যর উৎসের বাছবিচার না করেই কোনো ইস্যুতে তাদের ইচ্ছেগুলো নিবৃত করছে তুলনামূলক সহজলভ্য উত্স থেকে। ফলশ্রুতিতে চটকদার শিরোনামে আটকে গিয়ে মানসম্মত সংবাদপত্র থেকে সঠিক খবর প্রাপ্তির অপেক্ষা করছে না। তবে চটকদার শিরোনাম সরবরাহকারীদের দৌরাত্ম্য দিনদিন বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কুফল হলো ধর্মীয় ইস্যুর মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিশেষ গোষ্ঠীকে উত্তেজিত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি। 

সে কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের টিনের চালাঘর থেকে শহুরে অট্টালিকায় সকালের চায়ের সঙ্গী যেন ইত্তেফাক হয় এবং বিতর্কিত কোনো ইস্যুর ক্রসচেকিংয়ের ক্ষেত্রে যেন মানুষ ইত্তেফাককে মনে করে, সেসব কর্মপরিকল্পনাই গৃহীত হোক ইত্তেফাকের এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে।

আবার তথ্যের অবাধ বিচরণের এই যুগে কুসংস্কার ও গুজব ছড়ায় বাতাসের আগে আগে। সমাজ বাস্তবতার এই ক্ষেত্রটিতে অসত্য খবর ও খবর সরবরাহকারীদের বাড়-বাড়ন্ত রোধে অসত্য খবরের বিপরীতে সঠিক খবরের তৎক্ষণাৎ উপস্থাপন বড় ধরনের সমাজ বিপর্যয় রোধে টোটকার মতো কাজ করবে। সে কারণে শুধু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন-ই নয়, অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গিয়ে দেশীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিতে হবে ইত্তেফাককে। 

তবে শুধু তথ্যের ক্ষেত্রে নয়, সমাজের কোনো অসংগতির জন্যে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নিরুপায় মানুষ, ঠিক কোন কারণে দিনের পর দিন কোন গোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান অসমতাগুলো উল্লেখ করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনেও ঐতিহ্যর ইত্তেফাক ভূমিকা রাখতে পারে।

যদিও মানুষ দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে কী ভাবছে বা সমাজের কোন খাতটিকে সংস্কারকল্পে প্রাধান্য দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে তা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা কখনো কখনো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, জনবান্ধবতার নিরিখে ইত্তেফাকের দায়বদ্ধতার জায়গাটিকে রাখতে হবে অমলিন।

লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা-১৩৪২

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন