ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততায় ৬৯ বছরে পদার্পণ 

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৪:২৬

সংবাদপত্রকে বলা হয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের যুগান্তকারী গণমাধ্যম। নিরপেক্ষ, যৌক্তিক ও সত্য প্রকাশে আপসহীন বস্তুনিষ্ঠ স্বচ্ছ দর্পণ। যেথায় প্রতিফলিত হয় রাষ্ট্রীয় ও বিশ্বব্যবস্হার আলোচিত প্রতিচ্ছবি। সমালোচিত হয় নাগরিকদের অধিকার ও সমসাময়িক কার্যকলাপ। ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তেমনই কিছ~ ঘটনাবহুল বিষয় নিয়ে সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নবরূপে আত্মপ্রকাশ করে দেশের স্বনামধন্য ও পাঠকনন্দিত জাতীয় পত্রিকা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। নানাবিধ চড়াই-উৎরাই ও কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে সুদীর্ঘ ৬৮ বছর পেড়িয়ে আজ সফলতা ও অর্জনের ৬৯ বছরে পদার্পণ করেছে পত্রিকাটি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পরপরই পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালি জাতির মুখপত্র হিসেবে একটি পত্রিকার আবশ্যকতা জরুরি হয়ে পড়ে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট ইত্তেফাকের প্রথম সাপ্তাহিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সাপ্তাহিকটি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র পুরান ঢাকার ৯, হাটখোলা রোডে অবস্হিত প্যারামাউন্ট প্রেস কর্তৃক মুদ্রিত ও ৯৪, নবাবপুর থেকে প্রকাশিত হতো। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে বাঙালি জাতির জাতীয় স্বার্থ আদায়, গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক উত্থান-পতনে ইত্তেফাক অবিস্মরণীয় কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের সপক্ষে দলমত গঠনে, ১৯৫৮ সালে জারিকৃত সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, ১৯৬৬ সালের ৬ দফার দাবিতে, ১৯৬৯ সালের গণ-অভু্যত্থানে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে ইত্তেফাক মস্তক উঁচু করা বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখে। যার ফলে বিভিন্ন সময়ে ইত্তেফাককে পতিত হতে হয় অত্যাচারীদের ক্রোধের শিকারে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় পত্রিকা অফিস। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সত্যনিষ্ঠ, তেজস্বী, অধিকার আদায়ী কলাম লেখনীর কারণে বারংবার তাকে বন্দি করা হয় কারাগার প্রকোষ্ঠে। তবুও থেমে থাকেনি কলমের কালি। বাঙালি জাতির শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস, খর্বকৃত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার, নানাবিধ নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান জানান দিয়েছে কলমের প্রতিটি আঁচড়ে; পত্রিকা পৃষ্ঠের পরতে পরতে!

স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৫ সালের ১৭ জুন দৈনিক ইত্তেফাককে জাতীয়করণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আপসহীন মুক্তিকামী চেতনাকে লালন করে, ধারালো অস্ত্রের মতো দ্বিধাহীন সুতীক্ষ্ণ লেখনীকে ধারণ করে, নির্ভীক চিত্তের কল্যাণময়ী উদ্দীপনায়, আদর্শ জাতি গঠনের উপজীব্যের ভাবনা ধারায়, অপ্রতিরোধ্য বীর যোদ্ধার মতো এখনো কলমযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইত্তেফাক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরছে গণমানুষের দর্শন ইন্দ্রিয়ে। প্রকাশ করছে জানা-অজানা সত্যসমূহকে পরিস্ফুটিত তথ্য আকারে।

দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্ম সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে; কল্পনা পটকে পশ্চাতে ফেলে বর্তমানে পত্রিকার পাতায় নিজস্ব কলামে সমাজ ভাবনার চিত্র আঁকে। আর এ জায়গাটি তৈরি করে দিয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক তাদের ‘নতুন প্রজন্মের ভাবনা নামক তরুণ লেখকদের জন্য বিশেষ পাতা সংযোজনের মাধ্যমে। সপ্তাহের পাঁচটি কর্মদিবসে তরুণ প্রজন্মের লেখকদের লেখা নিয়ে ইত্তেফাক প্রকাশ করে তাদের এই বিশেষ পাতা। যেখানে স্হান পায় তরুণ মনের নবীন অনুভূতি, আবেগ-ভাবাবেগ ও চিন্তন-চেতনার বিশেষ সমষ্টি। তাই তো দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ থেকে শুরু করে বর্তমানে নবীন লেখক ও পাঠকদের কাছেও ইত্তেফাক পেয়েছে মর্যাদাপূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা; তাদের অপরিমেয় নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

দৈনিক ইত্তেফাক আজ কোটি মানুষের নিকট সত্য পৌঁছে দেওয়ার বিশ্বস্ত দিশারি। মিথ্যার বেসাতিদের রক্তবর্ণ চক্ষুকে উপেক্ষা করে জিঞ্জির ভেদকরা আলোর মশালধারী। যে আলোর রং সত্য, সুন্দর এবং গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত অনিন্দ্য উপমার সংমিশ্রণ। আর তাই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ৬৮ বছর পেড়িয়ে বিশ্বাস ও ভালোবাসার এই জায়গাকে সমুন্নত রেখে ইত্তেফাক এগিয়ে চলুক আপন গতিতে; স্বমহিমায় জাতির স্বপ্ন ও স্বার্থকতার পথে। নতুন প্রজন্মের একজন তরুণ লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেই এমনটিই প্রত্যাশা। আজকের এই বিশেষ দিনে পত্রিকা ও পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি রইল অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/কেকে