যে পরিবারে একজন মাদকাসক্ত থাকে, সেই ভুক্তভোগী পরিবারমাত্রই জানে মাদকের ছোবল বিষধর সাপের ছোবলের চেয়েও বেশি। একটি পরিবার তিলে তিলে শেষ হয়ে যায়, ভোগ করে নরকযন্ত্রণা। সমাজের কাছে, আত্মীয়স্বজনের কাছে মাথা হেঁট করে থাকতে হয়। কোনো পরিবারের একজন সদস্য মাদকাসক্ত হলে সেই পরিবারের কর্তাব্যক্তির ঘাড়ে চেপে বসে তার দায়ভার। একজন ভুক্তভোগীকে পাবনার মানসিক স্বাস্হ্য হাসপাতালের সিনিয়র এক ডাক্তারের কাছ থেকে শুনতে হয়েছিল, ‘আপনার ভাইকে মানুষ করতে পারেননি কেন?’
অনেক ধরাধরি করে হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারলেও মাত্র দু মাসের মাথায় হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে দেয়। বলে দেওয়া হয় নিকটস্হ সরকারি হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগ থেকে চিকিত্সা নিতে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে নিয়মিত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো এবং মাদক থেকে দূরে রাখা—এই তিনটি কাজ একসঙ্গে করতে হয়। সবচেয়ে কঠিন হলো মাদক থেকে দূরে রাখা। শুধু কঠিন বললে কম বলা হবে। এক কথায় অসাধ্য। এই অসাধ্য কাজটি করতে গিয়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তির হাতে অনেকসময় খুন হয় তার পরিবারের সদস্য! এমন খবর বিরল নয়। মাদক এখন মহামারির মতো পৃথিবীর সমস্ত জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে। লক্ষ কোটি পরিবার মাদক মহামারির কবলে।
কিন্তু এইসব বিপন্ন পরিবারকে যুদ্ধটা করতে হয় একা। না সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান আছে তাদের পাশে দাঁড়াবার, না আছে কোনো সামাজিক সংগঠন। সরকারি হাতেগোনা দু-চারটা প্রতিষ্ঠান আছে যা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য, সেবার মানও তথৈবচ। এই সুযোগে মুনাফালোভী একটি শ্রেণি গড়ে তুলছে মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র, যেখানে না মিলছে শুশ্রূষা, না মিলছে চিকিত্সা। মাদকাসক্তকে মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে রেখে চিকিত্সা করাতে চাইলে গুনতে হয় অনেক টাকা, যা নিম্নবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সামর্থে্যর বাইরে; ফলে মাদকাসক্ত বিপুল জনগোষ্ঠী মাদক সেবন থেকে জীবিত অবস্হায় আর ফিরতে পারে না।
কতদিন চিকিত্সা করলে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদকমুক্ত হবে তারও নিশ্চয়তা নেই। ছয় মাস বা এক বছর রাখার পরও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর রোগী পুনরায় মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। অর্থাত্ কোনো ফল লাভ হয় না। নিরাময়কেন্দ্রগুলো রোগীদের কী চিকিত্সা করে তা দেখভাল করার তো কেউ নেই। মারধর আর ঘুমের ওষুধই চিকিত্সা! একজন মাদকাসক্তেরও পরিবার আছে, স্বজন আছে। সেই স্বজনরা ভোগ করেন সীমাহীন দুর্ভোগ। কেউ নাই তাদের পাশে। এর কি কোনো প্রতিকার হতে পারে না? রাষ্ট্র কি নীরবই থাকবে? পরিবার কি তুলে দিয়েছিল তার আদরের সন্তানের হাতে মাদক? তবে এ যাতনা কেন পরিবার একাই বহন করবে? সরকারিভাবে কি গড়ে উঠতে পারে না মানসম্পন্ন পর্যাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র? আর মাদক বেচা-কেনা বন্ধ হলে তো আর কোনো কথাই থাকে না। মানুষ বলে, সব সমস্যারই নাকি কোনো না কোনো সমাধান আছে। একজন মাদকাসক্তের পরিবার জানে এই অভিশাপের নিগড় থেকে মুক্তি নাই।
কোনো সমাজবিজ্ঞানী কি কোনো প্রতিকার বাতলে দিতে পারবেন? দয়া করে কেউ বলবেন না পরিবার তাকে মানুষ করতে পারেনি তাই এ দায় তার পরিবারের। এ দায় রাষ্ট্রেরও। মাদক সহজলভ্য না হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী মাদকাসক্ত হতে পারত না। মাদকাসক্ত এবং তার পরিবারের পাশে রাষ্ট্রকেই দাঁড়াতে হবে। চিকিত্সাসেবা পৌঁছে দিতে হবে। সরকারিভাবে গড়ে তুলতে হবে পর্যাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র।
