আর কবে সচেতনতা আসিবে!

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:১৯

শৈশবকাল হইতে আমরা পরীক্ষার খাতায় লিখিয়া আসিয়াছি, ‘উক্ত সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা’; কিন্তু সেই সচেতনতা যে কী বস্তু তাহা কখনো খোলাসা করিয়া বলা হয় না। অথবা বলিলেও কাহারো কর্ণগোচরে পৌঁছায় না। সচেতনতা বলিতে আমরা বুঝিতে পারি, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের সমস্যার প্রতি মানুষের কর্মসূচি, সমাজে বিদ্যমান নানাবিধ সমস্যা, যাহা শান্তি বিনষ্ট করিবার জন্য দায়ী, তাহার বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং সর্বোপরি নিজের ও সমাজের মানুষের অধিকার-কর্তব্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা।

সচেতনতা তৈরি হইবার পিছনে কিছু নিয়ামক বিশেষ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্ঞান, পারিপার্শ্বিক ভাবনাচিন্তা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন মানিয়া চলিবার প্রবণতা ইত্যাদি সচেতনতার মূল প্রভাবক হিসাবে সর্বজনস্বীকৃত। তবে উদ্বেগের বিষয় হইল—আমাদের দেশে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিরাজ করিতেছে এক অদ্ভুত কেয়ারলেসনেস। ব্যক্তিগত জীবন হইতে শুরু করিয়া জাতীয় জীবনের সর্বত্রই বিরাজমান এই অসচেতনতা কখনো কখনো আমাদের জন্য আত্মঘাতী হইয়া উঠে বইকি!
 
সমাজে চলিতে-ফিরিতে আমরা দেখিতে পাই, সাধারণ মানুষের অসচেতন এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন কার্যকলাপ। সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত কিংবা উচ্চশিক্ষিত মানুষজনও ইহার বাহিরে নহে। দেখা যাইতেছে, মানুষজন অনেক সময় ধূমপান করিয়া সিগারেটের উচ্ছিষ্ট অংশ যেইখানে-সেইখানে ফেলিতেছে। তাহারা ভাবিয়া পর্যন্ত দেখিতেছে না সিগারেটের এই উচ্ছিষ্ট অংশ দাহ্য কিংবা বিস্ফোরক কোনো কিছুর সংস্পর্শে আসিলে সেইখানে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড কিংবা বিস্ফোরণ ঘটিতে পারে এবং ইহার ফলে প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটিবার আশঙ্কা থাকিয়া যায়। এই ধরনের অসচেতন কর্মকাণ্ড এবং ইহার ফলে ঘটা দুর্ঘটনার নজির নিতান্তই কম নহে। মানুষের অসচেতনতার দৃষ্টান্ত আমরা দেখিতে পাই সড়কপথেও। সিগন্যাল এবং ট্রাফিক আইন না মানিয়া রাস্তাঘাট পার হইতে গিয়া অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হইতেছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অনেক সময় চালককে এককভাবে দায়ী করা হইলেও মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণও এই ক্ষেত্রে কম দায়ী নহে।

আবার অসচেতনতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বিদ্যমান রহিয়াছে সমাজ ও রাষ্ট্রের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির ভিতরেও। কোথাও কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটিলে সেইখানে প্রকাশ পাইতেছে কর্তৃপক্ষের অবহেলা কিংবা যথাযথ তদারকির অভাব। ইহা তো হইবার কথা নহে। যাহারা কোনো কাজে যথাযথ দায়িত্বপ্রাপ্ত তাহারা যদি কর্তব্যের অবহেলা করে, উদাসীনতা দেখাইয়া ফেলিয়া রাখে, তাহা হইলে অঘটন তো ঘটিবেই। কখনো কখনো এই সকল অঘটনের চড়া মূল্য দিতে হয় মানুষের মহামূল্যবান জীবনের বিনিময়ে। এক দিকে সাধারণ মানুষের অসচেতনতা অন্য দিকে ম্যানেজমেন্টের উদাসীনতা অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই যেন দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রতিযোগিতা চলিতেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র বিরাজমান এই কেয়ারলেসনেস আমাদের হতাশ না করিয়া পারে না। অথচ সুস্থ-সুন্দর ও নিরাপদভাবে জীবন যাপন করিতে আমাদের স্বীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যজ্ঞান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা আবশ্যক। ইহা কেবল সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নহে, যাহারা নীতি নির্ধারণ করিয়া থাকেন তাহাদের বেলাতেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, আমরা সভা, সেমিনার, আলোচনা, বক্তৃতায় কেতাবি ভাষায় সচেতনতা বাড়াইতে বলিয়াই কাজ সারি; কিন্তু সেই সচেতনতা কীভাবে আসিবে, কীভাবে মানুষ নিজের ও সমাজের সমস্যাগুলির ব্যাপারে আরো সচেতন হইবে, নিজের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাইবে তাহা বলিতে ভুলিয়া যাই। শুধু সচেতনতা বাড়াইতে বলিলেই রাতারাতি সচেতনতা তৈরি হইবে না; বরং সমস্যার গভীরে যাইয়া সমাধানের পথ প্রশস্ত করিলেই মানুষ সচেতন হইবে। আমরা আশা রাখি, মানুষ নিজের ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হইয়া ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করিবে।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন