বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:৪৫

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সম্পর্কে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছেন। এই আলোচনা সমাপ্ত হওয়ার আগেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল মন্তব্য করেছেন, এই আলোচনা দ্বারা কিছু হবে না, বর্তমান সরকারকে না সরালে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। ফখরুল বর্তমান সরকারকে অপসারণের পন্থাটা কী হবে তা জানাননি। একটি রাজনৈতিক দল, তিন তিনবার নির্বাচনে যাদের ভরাডুবি হয়েছে, তারা নিশ্চয়ই তাদের দাবি মোতাবেক একটি ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতা ত্যাগের কথা বলতে পারেন না। বর্তমান সরকার পদত্যাগ করে কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে তার নিশ্চয়তা নেই। বিএনপির প্রেসিডেন্ট ইয়াজ উদ্দিন এরূপ একটি তত্ত্বাবধাক সরকার গঠন করেছিলেন। তা তারা রাখতে পারেননি। সামরিক বাহিনীর এক থাবায় বিনা রক্তপাতে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল।

এবারও যদি এমন হয়, শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন, নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলো, তারা কি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন? দেশের রাজনীতির বাস্তবতা উপলব্ধি করে বিএনপির উচিত রাষ্ট্রপতির আলোচনায় যোগদান করা এবং দেশে যাতে শান্তিপূর্ণভাবে একটি নির্বাচন হয় তার ব্যবস্হা করা। রাষ্ট্রপতি নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব করবেন বলে মনে হয় না। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও একজন নিতান্ত সাধারণ সরল মানুষ। ডেপুটি স্পিকার ও স্পিকার থাকাকালে তিনি বারবার নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। অতীতে বিরোধী দলও তা স্বীকার করেছে। অতএব, তার মনোনয়ন প্রসঙ্গে সন্দেহ পোষণের অবকাশ কম।

আমার ধারণা, মির্জা ফখরুলের আগামী নির্বাচন কমিশনার অথবা আগামী নির্বাচন সম্পর্কে ভয় করার কিছু নেই। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ গত দুই নির্বাচনে ভোট কারসাজি করেছে। তাদের এই দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে তৃতীয়বার এই কারসাজি করার সুযোগ আওয়ামী লীগের থাকবে না। কারণ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এবার বাংলাদেশের নির্বাচনের ওপর কঠোর দৃষ্টি রাখবে। দেশের মানুষও অত্যন্ত সজাগ। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেখা গেছে, বিএনপি মাঠে না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা দলে দলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হয়েছে। দেশে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। তার অধিকাংশ সুফলই কোটিপতিদের ঘরে গেছে। সাধারণ মানুষের ঘরে গেছে কম। তার ওপর আওয়ামী লীগের একশ্রেণির এমপি-মন্ত্রীর দুর্নীতি ও অবিচার বিএনপির আমলকে ছাড়িয়ে যেতে চলেছে। সাধারণ মানুষের মনে এই অত্যাচার-অবিচারের কারণে দারুণ ক্ষোভ জন্মেছে। আগামী নির্বাচনে এই প্রটেস্ট ভোট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যাবে। আমি কোনো কারণ দেখি না, বিএনপি নেতারা কেন নির্বাচনে যেতে এবারও ভয় পাচ্ছেন। তারা বারবার নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখেছেন। শেখ হাসিনা অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। কিন্তু তার দল আওয়ামী লীগ মানুষের কাছে আজ চরমভাবে নিন্দিত। আগামী নির্বাচনে আমার ভোটটিও আওয়ামী লীগকে দেব কি না সন্দেহ! আওয়ামী লীগ শাসনামলে যে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে আশা করেছিলাম, সেই বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি। যে বিরাট উন্নয়ন গড়ে উঠেছে, তার অধিকাংশ সুফল নব্য ধনীদের পকেটে গেছে। সাধারণ মানুষের অবস্হার উন্নতি হয়েছে কম। ঢাকার রাজপথে জনতার ভিড় দেখলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ঢাকায় যে এত মানুষের ভিড়, তার কারণ ক্রমবর্ধমান বেকার মানুষ মফস্বলের শহর থেকে ক্রমাগত ঢাকায় আসছে। আওয়ামী লীগ এই জনস্রোত বিপরীতমুখী করতে পারেনি। আগে যে মহাজোট সরকার ছিল, তা-ও নেই। রাশেদ খান মেনন বা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে বাদ দিয়ে শেখ হাসিনা কাদের মন্ত্রী করেছেন? তাদের এক প্রতিমন্ত্রী ইতিমধ্যে নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। মন্ত্রিত্ব হারালে কী হবে, তিনি এমপি পদ হারাননি। দেশে দুই রকমের আইন চালু রয়েছে। একটি আইন সাধারণ মানুষের জন্য। অপরটি সরকার যাদের পছন্দ করেন তাদের জন্য। সামান্য কারণে সাংবাদিক গ্রেফতার করে তার ওপর অত্যাচার করানো হয়। অথচ সরকারের পছন্দের কোনো লোক মদ খেয়ে রাস্তায় গাড়ি এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে মানুষ হত্যা করলেও তাদের বিচার হয় না। এক দেশে দুই রকম আইন চালু রয়েছে। এরকম ঘটনা পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই। এই আওয়ামী লীগের আমলে এ ধরনের অব্যস্হা সম্পর্কে আগেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। পরিমনির ঘটনাটি দেখা যায়, তাকে সম্ভবত মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। এখন নিম্ন আদালতে তারিখের পর তারিখ দিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। এ ঘটনার পেছনেও রয়েছে এক নারীলোলুপ ব্যবসায়ী এবং তার সহযোগী এক সরকারি কর্মকর্তার ষড়যন্ত্র। আগামী নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যদি পুনর্গঠিত না হয়, তার অন্তত ৮০ শতাংশ এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা না হয়, তাহলে আগামী নির্বাচনে কী হবে তা ভাবা যায় না।

ভারতে এখন বাংলাদেশের বন্ধু কম। আমেরিকা ও ইসরাইল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। দেশের ভেতরে সাবোটিয়াজরাও শক্তিশালী হয়েছে। শেখ হাসিনা সাবধান হন। মির্জা ফখরুলকেও বলি, অতীতের ব্যর্থ রাজনীতি আঁকড়ে না থেকে নতুন ও বাস্তব নীতি গ্রহণ করুন। সুষ্ঠু নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে সহায়তা করুন। রাজনৈতিক জটিলতা বাড়াতে চাইলে তার অনেক সূত্র পাবেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দয়া করে রাষ্ট্রপতিকে সহায়তা করুন।

আমার এই অনুরোধ সব রাজনৈতিক দলের প্রতি। অন্যদিকে শেখ হাসিনাকেও অনুরোধ জানাই, তিনিও যেন একজন নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে সহায়তা করেন। তার ওপর কোনো সরকারি প্রভাব না খাটান। দক্ষিণ এশিয়ায় তার একটি ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। শুধু ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে তিনি যেন সেই ভাবমূর্তি ধ্বংস না করেন। তার পরিবারের কেউ যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে চান, তারা যেন জনগণের ভোটের মাধ্যমে আসেন। কোনো প্রকার সরকারি প্রভাব পেছনে নিয়ে না আসেন। এই একুশ শতকে কোভিড মানুষের অনেক ক্ষতি করেছে, সেই সঙ্গে একাত্মতাও গড়ে তুলেছে। জনগণের মধ্যে নতুন চেতনাবোধ জেগে উঠেছে। সেই পরিবর্তনকে যেনো কোনো দেশের ক্ষমতাসীনেরা অগ্রাহ্য না করেন।

লন্ডন, ২৪ ডিসেম্বর, শুক্রবার, ২০২১

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন