সংবাদপত্র হলো জ্ঞানের আধার ও গণতন্ত্র রক্ষার আতুড়ঘর। বিশেষ করে জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রসমূহের পাতায় পাতায় জড়িয়ে থাকে দেশ ও জাতির প্রতিদিনের প্রতিচ্ছবি। আধুনিক জনকল্যাণকর রাষ্ট্রে সংবাদপত্র জনমত সৃষ্টিরও অন্যতম মাধ্যম।
এর কল্যাণের মুহূর্তের মাঝে চলমান রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও ব্যবসায়িক অঙ্গনসহ প্রতিটি অংশের সঙ্গে জনগণ সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। দৈনিক ইত্তেফাক বাঙালি জাতীয় জীবনে এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র। এর সুবিন্যস্ত সংবাদ প্রকাশের জন্য বাঙালি জাতির সার্বভৌমত্বের বিকাশ ঘটেছে। এমনকি দৈনিক ইত্তেফাকের হাত ধরেই স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র হিসেবে আজকের বাংলাদেশের পরিস্ফুটন ঘটেছে।
পাকিস্তানি শাসকদের সীমাহীন শোষণ-বঞ্চনা ও নিপীড়নের সময়গুলোতে বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশে, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও দেশপ্রেমের অকুতোভয় সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সাহসী পদক্ষেপে আত্মপ্রকাশ ঘটে দৈনিক ইত্তেফাকের।
যদিও এর আগে ইত্তেফাক সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতো। ইত্তেফাক প্রকাশের শুরু থেকে পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের চিত্র ও পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার আদায় নিয়ে ন্যায়সঙ্গত সংবাদ পরিবেশন করেছে। আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের তীব্র সমালোচনা ও কঠোর প্রতিবাদপূর্ণ ভাষায় লেখার জন্য সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করে অদম্য সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে এক বছর জেলে আটকে রাখে পাকিস্তানি শাসকরা। এরপর ১৯৬৩ সালে তাকে আবারো গ্রেফতার করা হয়। এসময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনাকে নিষিদ্ধকরণ ও নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেসকে বাজেয়াপ্ত করে সরকার।
আইয়ুব সরকার পতন ও ৬ দফা দাবির স্বপক্ষে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহসী শিরোনাম ছিল জনগণের অনুপ্রেরণা। এমন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর প্রকাশনা ও প্রচারণাকে পুরোপুরি বন্ধ করা হয়। কিন্তু জনগণের প্রতিবাদের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নিতে বাধ্য হলে ১৯৬৯ সাল থেকে আবারো নিয়মিত প্রকাশনা নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় রাষ্ট্রীয় অবস্থার বার্তা নিয়ে হাজির হয় দৈনিক ইত্তেফাক এবং এর পরবর্তী সময়কালে পাকিস্তানি শাসকদের নির্যাতনের প্রতিবাদে ‘রাজনৈতিক হালচাল’ ও ‘মঞ্চে নেপথ্যে’ কলামে মানিক মিয়ার ছদ্মনাম ধারণ করে তার লেখা চালিয়ে যান; যা ১৯৭০-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয়ের আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথ সুগম করতে নিরন্তর ভূমিকা রাখে।
আজও স্বাধীনতা জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পাকিস্তান আমলের দৈনিক ইত্তেফাকের সংরক্ষিত পেপার কাটিংগুলো জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেই বীভত্স মুহূর্তগুলোর কথা। বাংলাদেশের উদ্ভাবনে ও বিনির্মাণে দৈনিক ইত্তেফাকের বলিষ্ঠ পদচারণাকে জাতি আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে যাবে। বর্তমান সময়েও অগণিত সংবাদপত্র ও ওয়েব পোর্টালের ভিড়ে ইত্তেফাক তার ভাবমূর্তি বজায় রেখেছে। দেশে ও দেশের বাইরের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরে জনগণের তথ্যসেবা নিশ্চিত করছে।
অন্য সব আয়োজনের পাশাপাশি ইত্তেফাক ‘নতুন প্রজন্মের ভাবনা’ শীর্ষক মতামত প্রকাশের মাধ্যমে নিত্যনতুন লেখক তৈরিতে অবদান রেখে যাচ্ছে, অবদান রাখছে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ে নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতি রক্ষায়। এছাড়া এর ‘সাহিত্য সাময়িকী’র আয়োজন নতুন নতুন গল্পকার ও কবিকে সমাজের সকলের সামনে তুলে ধরছে। তাইতো এখনো সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষত্বের দিক থেকে ইত্তেফাক মানে শুধুই ইত্তেফাক। প্রকাশনার এই ঊনসত্তর বছরে এসে দৈনিক ইত্তেফাক দেশ ও জাতির কল্যাণে বরাবরের মতোই গণমানুষের পক্ষে নিরপেক্ষতা ও বস্ত্তনিষ্ঠতা বজায় রেখে আদর্শ দেশ গঠনে নিয়মিত সংবাদ পরিবেশন অব্যাহত রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।
লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
