গোপালপুরে মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে হয়রানি

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:১৪

সাজনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাকসুদা বেগমের সন্তান প্রসবের তারিখ ছিল ৩ অক্টোবর। এক সপ্তাহ আগেই ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য শিক্ষা অফিসে আবেদন করেন তিনি। শারীরিক জটিলতার জন্য ডাক্তারের পরামর্শে গত ২ সেপ্টেম্বর শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজার করে সন্তানের মা হন তিনি। ৪ সেপ্টেম্বর ছুটি নিশ্চিত্বের জন্য এক আত্মীয়কে ডাক্তারের সনদসহ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পাঠান। কিন্তু শিক্ষা অফিসার মর্জিনা পারভীন প্রসূতি ও নবজাতককে সরাসরি অফিসে নিয়ে আসতে বলেন। নিজের চোখে না দেখে ছুটি মঞ্জুরের নিয়ম নেই বলে সাফ জানান। অগত্যা গত ২০ সেপ্টেম্বর মাকছুদা বেগম ১৮ দিনের নবজাতক এবং অশীতিপর বৃদ্ধা মাকে সঙ্গে নিয়ে উপজেলা পরিষদ ভবনের তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে শিক্ষা অফিসে যান। মাকছুদা জানান, সিজারের পর শরীর ছিল খুবই নাজুক। ম্যাডামের কড়া নির্দেশে অতিকষ্টে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে অফিসে গিয়ে ছুটি নিশ্চিত করি।

মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে একই ভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন ভেঙ্গুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা কানিজ ফাতেমা। দ্বিতীয় বার মা হতে গেলে ডাক্তার সন্তান প্রসবের তারিখ দেন ১৫ নভেম্বর। কিন্তু ২২ অক্টোবর প্রসব বেদনায় সিজার করে তার সন্তান হয়। দুই দিন পর স্বামী গোলাম মাওলা ডাক্তারের সনদসহ ছুটির দরখাস্ত নিয়ে গেলে শিক্ষা অফিসার ছুটি মঞ্জুর করতে অস্বীকৃতি জানান। বরং বিনা ছুটিতে কেন সন্তান প্রসব ও স্কুল কামাই করেছেন সেই অভিযোগে শোকজ করেন। একই ভাবে হয়রানি হন ভোলারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক উম্মে হাবীবা। তিনিও ডাক্তারের দেওয়া তারিখের ৩৫ দিন আগে সন্তান প্রসব করেন। স্বামী সোহানূর রহমান ডাক্তারের সনদপত্রসহ ছুটির আবেদন নিয়ে গেলে আগে প্রসূতি ও নবজাতককে অফিসে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে অসুস্হ প্রসূতিকে অফিসে হাজির করে প্রমাণ দিতে হয়েছে যে তিনি সত্যিই সন্তান প্রসব করেছেন। ছুটি নিয়ে আরো হয়রানি হন সূতি হিজলীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সালমা খাতুন ও জোত আতাউল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাসলীমা খাতুন। সালমা খাতুন জানান, সন্তানসম্ভবা একজন নারীকে ডাক্তাররা ভারী কাজ করা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানা করেন। সিজারের পরও একই পরামর্শ থাকে। এমতাবস্হায় সন্তানসম্ভবা মা অথবা প্রসূতিকে ছুটির জন্য তিনতলা সিঁড়ি মাড়িয়ে অফিসে যাওয়া-আসা অনেক কষ্টের।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আঃ করিম জানান, গত আগস্টে মর্জিনা পারভীন এখানে যোগদানের পর প্রসূতিরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বারান্দায় বেআইনি নোটিশ টানিয়ে শিক্ষকদের দুপুর ৩টার আগে অফিসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছেন। এতে মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য আসা শিক্ষকরাও বিড়ম্বনা পোহান।

অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা অফিসার আনোয়ার হোসেন জানান, বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের মাতৃত্বকালীন ছুটি বিধিমালা অনুযায়ী একজন নারী গর্ভবতী হওয়ার পর যে তারিখ হতে ছুটিতে যাওয়ার আবেদন করবেন সেই তারিখ থেকে ছয় মাসের ছুটি পাবেন। ডাক্তারি সনদসহ করা আবেদন নামঞ্জুর করার এখতিয়ার কারো নেই। জরুরি ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের পরে ছুটি দেওয়া কতৃ‌র্পক্ষের মানবিক দায়। এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মর্জিনা পারভীন জানান, গর্ভবতী না হয়েও মহিলা শিক্ষকরা অনেক সময় ভুয়া সনদ যুক্ত করে ছুটি চান। প্রতারণা বন্ধের জন্য প্রসূতিদের সরাসরি অফিসে আসতে বলা হয়। নোটিশ সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো কোনো শিক্ষক স্কুল কামাই দিয়ে দালালি করতে আসেন। সেসব দালালদের জন্যই ঐ নোটিশ।

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার জানান, একজন নারী কর্মকর্তা অপর একজন কর্মজীবী নারীর প্রসূতিকালীন ছুটি নিয়ে এমন অমানবিক আচরণ করতে পারেন না। শিক্ষা বিভাগকে অবশ্যই সরকারি নীতিমালা মানতে হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজ মল্লিক জানান, নারী শিক্ষকদের হয়রানি এবং অফিসে আগতদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করার মৌখিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। লিখিত অভিযোগ পেলে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্হা নেওয়া হবে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শরীফুল ইসলাম জানান, মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে হয়রানি নিন্দনীয় কাজ। সরকারি অফিসে এমন নোটিশ টানানো বেআইনি।

ইত্তেফাক/কেকে