রেমিট্যান্স আমাদের দাঁড়ানোর শক্তি 

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০৬:১০

স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ক্রমান্বয়ে বিদেশে আমাদের শ্রমবাজার খুলতে শুরু করেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ প্রবাসী বিদেশে গমন করেছেন এবং তা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ, আফ্রিকার মতো দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারিত। দেশের বেকার সমস্যা সমাধানে শ্রমশক্তি রপ্তানি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। মূলত বিদেশে কর্মরত মানুষের উপার্জিত টাকা দেশে পাঠালে সেই টাকাকে রেমিট্যান্স বলে। রেমিট্যান্স হলো দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বৈদেশিক সম্পদ অর্জনের অন্যতম প্রধান উত্স হলো রেমিট্যান্স। অর্থনৈতিক উন্নয়ন রেমিট্যান্সের অবদান মোট জিডিপির ১২ শতাংশ এবং বিশ্বে রেমিট্যান্স পাঠানোর দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্হান সপ্তম। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রবাসীরা দেশে যে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তা মোট রপ্তানি আয়েরও অর্ধেক।

তৈরি পোশাকের পরে অর্থনীতিতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের অবদান সবচেয়ে বেশি, অর্থাত্ দ্বিতীয় স্হানে আছে। জাতীয় অর্থনীতিতে রপ্তানি খাতের অবদান তথা মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। কারণ পণ্য বাবদ যে অর্থ উপার্জিত হয়, এর বড় অংশ কাঁচামাল আমদানিতে বা উপযোগী করে তুলতে চলে যায়। তাছাড়া বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তো আছেই। কিন্তু জনশক্তি রফতানি খাত এমন এক অর্থনীতির খাত, যার উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে।

করোনায় রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু ২০২০ সালের প্রথম তিন মাসে প্রবাসীরা অনেকে ফেরত আসতে শুরু করেন, পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ান, সরকারকে ভাবনায় ফেলে দেয়, রেমিট্যান্সের প্রবাহ তখন হ্রাসের দিকে। পুরো কোভিড-১৯-এ এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে দেশের অর্থনীতিবিদেরা ধারণা পোষণ করেছিলেন। এই ধারণা চমকে দিয়ে রেমিট্যান্স কিন্তু বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশ থেকে কর্মসংস্হানের জন্য দেশের পরিবার-পরিজনের মায়া ত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। অনেকে প্রতারণার স্বীকার হচ্ছেন। রিক্রুট এজেন্সিগুলো অর্থের লোভে ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ঠেলে দিচ্ছে। কত মায়ের সন্তানের সলিল সমাধি হচ্ছে। প্রতারকদের জালে আটকা পড়ে মাসের পর মাস জঙ্গলে অনাহারে অনিদ্রায় অবস্হান করে কেউ কাঙ্ক্ষিত দেশে প্রবেশ করে সোনালি স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেও ফেলে। কিন্তু যে ফিরে আসে, পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। যারা প্রবাসীদের নিয়ে প্রতারণা করে, তাদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বৈধভাবে শ্রমশক্তি রপ্তানি আরো সহজীকরণ করতে হবে। বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। বিদেশি মিশনগুলোকে ওদের কর্মক্ষেত্রের বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখতে হবে। প্রবাসীরা ভালো থাকলে দেশে পরিবারগুলো ভালো থাকবে। ব্যাংকের মাধ্যমে পরিবারের কাছে টাকা পাঠাবে, এই অর্থ কেবল পরিবারের প্রয়োজনই মেটায় না, তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যাংকে সঞ্চয় করে ব্যাংকের তারল্যসংকট দূর করে। নানা ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোক্তা হয়ে কৃষি ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের বৃহত্তর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রেমিট্যান্সের ওপর ভর করেই হয়। এই রেমিট্যান্স প্রবাহের দিকে লক্ষ্য রেখেই পদ্মা সেতু করতে আমরা সাহস পেয়েছি। আরো বড় বড় মেঘা প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ কারণেই বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় অন্তভু‌র্ক্ত হওয়ার পথে। রেমিট্যান্স এখন আমাদের দাঁড়ানোর শক্তি ও নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। তাছাড়া বেকার সমস্যা সমাধানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

লেখক: ব্যাংকার, কলামিস্ট

 

 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন