স্বাধীনতার ৫০ বৎসরে দেশের জনসংখ্যা বাড়িয়াছে কয়েক গুণ। রাজধানী ঢাকা শহরেও প্রতিনিয়ত বাড়িতেছে মানুষের সংখ্যা। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকার তাগিদে সড়কে নামিতে হয়, ফলে পাল্লা দিয়া বাড়িয়াছে যানবাহনের সংখ্যা।
ইহার ফলে সড়কে যানজট আর বিশৃঙ্খলাও যে বাড়িয়াছে তাহা বলাই বাহুল্য। রাজধানীতে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা দূর করিতে বাস-রুট রেশনালাইজেশনের অংশ হিসাবে যাত্রা শুরু করিয়াছে ঢাকা নগর পরিবহন। প্রথম দফায় ঘাটারচর-মোহাম্মদপুর-গুলিস্তান-মতিঝিল-কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত ঢাকা নগর পরিবহনের ৫০টি বাস চলাচল শুরু করিলেও মোট ১০০টি বাস দিয়া পরিচালিত হইবে এই রুটের কার্যক্রম।
সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিবার লক্ষ্যে এমন ৪২টি রুটের পরিকল্পনা রহিয়াছে বলিয়া জানা গিয়াছে। বিপুল জনসংখ্যার এই মহানগরীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিবার লক্ষ্যে এই ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি, রাজধানীর সড়কগুলিতে অস্থিরতা এবং গণপরিবহনে নৈরাজ্য দূর করিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হইলেও তাহা কার্যত ফলপ্রসূ হয় নাই। রাজধানী ঢাকা শহরের সড়কগুলিতে বিশৃঙ্খলার বিষয়টি অনেক পুরোনো এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত গণপরিবহনের যে বিশৃঙ্খলা রহিয়াছে তাহা শৃঙ্খলায় আনা অত্যন্ত দুরূহ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আধুনিক শহরের মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ রাস্তাঘাট থাকা বাঞ্ছনীয়, অথচ ঢাকা শহরের মোট আয়তনের তুলনায় রাস্তাঘাট রহিয়াছে মাত্র ৭ হইতে ৮ শতাংশ। ইহার পাশাপাশি সড়কে রহিয়াছে আরো বহুবিধ সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা। রাজধানীতে চলাচলকারী বাসসমূহের মধ্যে বড় অংশই ফিটনেসবিহীন এবং অনেক বাসের নাই কোনো রুট পারমিট। সড়কের সমস্যা কেবল সড়কেই সীমাবদ্ধ নাই, রহিয়াছে চুরি এবং দুর্নীতির মতো প্রতিবন্ধকতা। এই সকল চ্যালেঞ্জকে সামনে রাখিয়া ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় ঢাকা নগর পরিবহন চালুর উদ্যোগটি অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়।
নগর পরিবহনের বাসে প্রথম দিন হইতেই ই-টিকিটিং সিস্টেম চালু হইয়াছে; পাশাপাশি এই রুটের প্রতিটি বাসের ড্রাইভার-স্টাফের নির্দিষ্ট পোশাক এবং আইডি কার্ডেরও ব্যবস্থা করা হইয়াছে। পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই রুটের বিভিন্ন ভুলত্রুটি আমলে লইয়া তাহা সংশোধনের ব্যবস্থাও রাখা হইয়াছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিআরআর পদ্ধতিতে একটি রুটে একটিমাত্র কোম্পানির বাস একই ব্যবস্থাপনায় চলাচল করিবে আর ২০২৩ সালের মধ্যে সমগ্র ঢাকা শহরে নগর পরিবহনের বাস চলিবে।
আমরা বুঝিতে পারি, শত প্রতিকূলতা এবং সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ বসিয়া নাই, তাহারা সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করিতেছে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণেরও উদ্যোগ লইতেছে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানাবিধ সমস্যা রহিয়াছে, ইহা থাকিবেই, রাতারাতি মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যায় পরিপূর্ণ ঢাকা শহরের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়া আসিবে না। তাহার পরও মন্ত্রণালয়, দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সড়কের বিভিন্ন সমস্যাকে আমলে লইয়া যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করিতেছে এবং তাহা ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নও করিতেছে, তাহাকে আমরা সাধুবাদ না জানাইয়া পারি না। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীতে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হইয়াছে, ইহার পাশাপাশি বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিকূলতাও মোকাবিলা করিয়া যাইতেছি আমরা।
সময় যত আগাইবে, সঠিক পরিকল্পনা আর যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ মোকাবিলা করিয়া আমরা আরো অগ্রসর হইব। ঢাকা নগর পরিবহনের কার্যক্রম কতটা সফল কিংবা ব্যর্থ হইবে তাহা সময়ই বলিয়া দিবে। তবে সঠিক তত্ত্বাবধান এবং শৃঙ্খলার সহিত উদ্যোগটি পরিচালিত হইলে উহা নগরবাসীর সড়কপথে নিত্যদিনের ভোগান্তিতে এবং যানজট নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করিবে বলিয়াই আশা করা যায়।
