সুগন্ধায় লাশের গন্ধ! 

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:৩২

নদীর নাম সুগন্ধা কিন্তু সেখানে এখন পোড়া লাশের গন্ধ। আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে স্বজন হারানোর করুণ আহাজারি। এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। যারা স্বজন হারিয়েছেন তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই। 

নদীতে চারদিকে অথই পানি। তার মধ্যে আগুনে পুড়ে মরতে এমন বিভীষিকার কথা কেউ ভাবেননি। কিন্তু হলো তা-ই। বৃহস্পতিবার (২৩ ডিসেম্বর) গভীর রাতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ নামের লঞ্চটিতে আগুন লাগে। 

রাত গভীর হওয়ায় তখন অনেকেই ছিলেন গভীর ঘুমে। কিন্তু সেই ঘুমটাই যেন চিরঘুম হয়ে গেল। আর জেগে উঠবার ফুরসত পাওয়া গেল না।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌপথের যাত্রাকে অনেকটা নিরাপদ ভাবা হয়। নৌপথের যাতায়াত সাশ্রয়ী। তাছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের বড় একটি অংশের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নৌপথ। ব্যাপকসংখ্যক যাত্রী নৌপথে চলাচল করে থাকেন। কিন্তু যাত্রী-নিরাপত্তার দিকটি বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। এ ব্যাপারে কঠোর নজরদারির কথা বলা হলেও কার্যকর হয়নি তা। 

প্রতিবার যেমনটি হয়, এবারও নিয়মাফিক তদন্ত কমিটি হবে। হয়েছেও। কিন্তু কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখবে কি না, যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আলোর মুখ দেখলেও যে সুপারিশ করা হবে, দোষীদের শাস্তির জন্য যে ব্যবস্থার কথা বলা হবে, সেটি করা হবে না। অথবা সম্ভব হবে না। কারণ এখানে একটি দুষ্টচক্র ক্রিয়াশীল। যারা আইনকানুনকে সব সময় বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসছেন। 

নৌযান কিংবা যে কোনো যানবাহন রাস্তায় নামাতে হলে সব ধরনের নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। নৌযানের ক্ষেত্রে ফিটনেস থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে নকশা অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ করা হয়েছে কি না, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যায় নকশা এক রকম, নৌযানটি নির্মাণ করা হয়েছে মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী, অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা যার অন্যতম লক্ষ্য। দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চটির নকশায় ত্রুটি ছিল। তাছাড়া জানুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদ ছিল লাইসেন্সের।

কর্তৃপক্ষীয় নজরেও লঞ্চটিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ড ও এর পরের ক্ষয়ক্ষতির জন্য নৌযানটির মাস্টার, সারেং, সুকানিসহ সব স্টাফকেই দুষছেন বেঁচে ফেরা যাত্রীরা। আগুন লাগার পরও ৩০-৪০ মিনিট চালিয়ে নদীর পাড়ে নিয়ে থামান লঞ্চের মাস্টার। এতে প্রাণহানির ঘটনা বেশি হয়েছে। লঞ্চে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

যারা কেবিনে ছিলেন, আগুন লাগার পরও তাদের বের হতে দেওয়া হয়নি। যদি আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতো, যদি জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকত, তাহলে যাত্রীরা সেগুলো ব্যবহার করে জীবন বাঁচাতে পারতেন। কিন্তু সাধারণত দেখা যায়, যাত্রীসংখ্যার তুলনায় জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম থাকে অপ্রতুল। ফলে যা হবার তা-ই হয়। 

বিপদের সময় সেগুলো ব্যবহারের কোনো সুযোগ থাকে না। অথচ পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম ছাড়া নৌযান চললে সেগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে আসার কথা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেগুলো কখনো খেয়াল করেন বলে মনে হয় না। তাহলে এত মানুষকে জীবন দিয়ে কর্তৃপক্ষের অবহেলার দায় শোধ করতে হতো না।

নৌদুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন মালদ্বীপ সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ গভীর শোক জানিয়ে নিহতের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চটি পরিদর্শন যান। তিনি হতাহতের ঘটনায় শোক ও সমবেদনা জানান। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তাসহ সব ধরনের সহযোগিতার কথাও তিনি বলেছেন।

আসলে মৃতু্যর কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। যারা স্বজন হারিয়েছেন অর্থের পরিমাণ বা সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, সেটি তাদের বেদনা ভোলাতে পারবে না। মানুষ চায় এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি। বারবার দুর্ঘটনা হবে কর্তৃপক্ষের অবহেলায়। তার দায় নিতে হবে মানুষকে জীবন দিয়ে, এটি হতে পারে না। যদি অপরাধীদের শাস্তি হতো, তাহলে ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যেত। আমরা দেখেছি, ‘দুর্ঘটনা’কে কখনোই অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। যে মামলা হয় কিংবা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তেমন সহায়তা পাওয়া যায় না। 

অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া যায় না। আইনগত জটিলতা থাকে। অপরাধীকে ‘অপরাধী’ প্রমাণ করাটাই কঠিন হয়ে পড়ে। কেননা ‘দুর্ঘটনা’ বলে সবকিছুকেই জায়েজ করা হয়। কিন্তু সুগন্ধা নদীতে দুর্ঘটনায় এতগুলো প্রাণহানি কি নিছক দুর্ঘটনা? এত হত্যাকাণ্ড যদি সবাই বিশেষ করে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতেন, তাহলে এই মানুষগুলোকে জীবন দিতে হতো না। আমরা চাই, নদীমাতৃক বাংলাদেশ নৌপথগুলো নিরাপদ থাকবে। সেখানে আকাশে-বাতাসে লাশের গন্ধ ভেসে বেড়াবে না।

এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে ইতিমধ্যে ৩৭ জন মানুষ সংখ্যা হয়ে গেছেন। হাসপাতালে আহত হয়ে ভর্তি শতাধিক দগ্ধ মানুষ। ফলে এই সংখ্যা আরো বাড়বে, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশে নৌদুর্ঘটনা নতুন নয়। প্রাণহানির ঘটনাও যেন অনেকটা রুটিন বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিবছর নৌদুর্ঘটনায় ২০৭ জন জীবন হারাচ্ছেন। 

নৌ, সড়ক ও রেল খাত রক্ষা জাতীয় কমিটির হিসাবমতে, ১৩ বছরে নৌদুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৬৮৮ এবং নিখোঁজ হয়েছেন ১ হাজার ২২ জন। মানুষের জীবনের কোনো মূল্য থাকলে এভাবে মৃতু্যর মিছিল দীর্ঘায়িত হতো না। দায়িত্বে অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে দেশে প্রতি বছর নৌদুর্ঘটনা বাড়লেও তা দেখার যেন কেউ নেই। নৌ মন্ত্রণালয় অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে নানা কথা বলে, কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছু একটা হয় না। না হলে দুর্ঘটনায় এত প্রাণহানি ঘটে কী করে?

দুঃখজনক যে, নৌযানগুলো বিলাসবহুল হয়েছে। হয়েছে দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু যাত্রী-নিরাপত্তা সেভাবে বাড়েনি। নৌপথগুলোতে ফিটনেসবিহীন নৌযান চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু নৌপথে ফিটনেসবিহীন নৌযানের ছড়াছড়ি। 

এছাড়া প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই চলে অধিকাংশ নৌযান। এসব তদারকির জন্য রয়েছে নৌপরিদর্শক। এছাড়া প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়মিত পরিদর্শন করার কথা রয়েছে। এর পরও দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। এ অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন। তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট 

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন