অস্বীকার করার উপায় নেই আমাদের দেশে উন্নতি তো কিছু কম হয়নি। স্বাধীন হয়েছি ৫০ বছর হলো। এ সময়ে মাথাপিছু আয় বেড়েছে। গড় আয়ুও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও বিদ্যুৎ চলে গেছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে দেশ। জামাকাপড়ে আগের দৈন্য আর নেই। দালানকোঠা প্রচুর হয়েছে। সড়কে অজস্র গাড়ি চলে। মেয়েরা শিক্ষা পাচ্ছে। তারা সব পেশাতেই ভালো করছে। আমাদের লোকেরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা সুনাম অর্জন করেছে, নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে।
তবে মুশকিল ঐ একটাই। সব উন্নতিই ঘটছে পুঁজিবাদী লাইনে। পাকিস্তান আমলে যে উন্নতি হয়নি তা তো নয়, উন্নতি হয়েছে; তবে তার চরিত্রও ছিল ঐ পুঁজিবাদীই, যার দরুন যত উন্নতি হয়েছে তত বৈষম্য বেড়েছে। আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধিটা বড় করে চোখে পড়েছে, ভেতরে ভেতরে শ্রেণিবৈষম্যও খুবই বাড়ছিল, যদিও সেটা তখন প্রধান রূপে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নতিও ঐ একই চরিত্রের। আঞ্চলিক বৈষম্য আগে যেমন পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর ব্যবধান হিসেবে জাজ্বল্যমান ছিল, এখন আর সেভাবে চোখে পড়ে না, যদিও তা আছে; উন্নতির স্টিম রোলারের নিচে পড়ে আদিবাসী জাতিসত্তার ক্ষুদ্র মানুষেরা বহু পুরুষ ধরে যে ভূমিতে তারা বসবাস করত সেখান থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে; পরিণত হচ্ছে উদ্বাস্ত্ততে। আপন দেশে উদ্বাস্ত্ত। আর বৈষম্য কমবে কী, উন্নতির সঙ্গে সমান তালে লাফাতে লাফাতে বেড়ে চলেছে। কোনো প্রকার ছন্দপতন নেই। এই উন্নতির আরেকটি স্বভাব হচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা। উন্নতির কুঠারাঘাতে প্রকৃতি বিপর্যস্ত হচ্ছে। নদীর পানির দূষণ বেড়েছে। নদী দখলে চলে গেছে ক্ষমতাবানদের। দূষণ ঘটছে বায়ুর। দূষণের বিচারে রাজধানী ঢাকার বায়ু এখন সহনীয় মাত্রার তিন গুণের নিচে নেমে গেছে। বাসযোগ্যতার দিক থেকে এই শহর এখন পৃথিবীর সর্বনিকৃষ্টতমদের একটি। উন্নতির প্রয়োজনে বৃক্ষনিধন কেবল ঘটনা নয়, উন্নতির প্রতীকও। শুনতে এখন অবিশ্বাস্য মনে হবে, কিন্তু ঢাকার গুলিস্তান এলাকায় স্বল্পপরিসরে যে একটি উদ্যান কোনোমতে টিকে আছে তার সমস্ত গাছ কেটে ফেলে সেখানে একটি মিলনায়তন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। রক্ষা পেয়েছে জনমতের কারণে। ২১ বছর পরে, ঠিক একইভাবে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছের গায়ে কুড়াল পড়েছে। গাছের উপকারিতা ও উপযোগিতার বিশদ বর্ণনা প্রয়োজন পড়ে না, সেটা সবারই জানা; তবে সেটাও নতুন করে জানতে হচ্ছে আমাদেরকে, বিপদে পড়ে। উন্নতির এই বিশেষ ধরনের আসল চরিত্র এটাই। আড়িয়াল বিল ধ্বংস করে সেখানে একটি বিমানবন্দর বসাবার যে পরাবাস্তবিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছিল, সেটাও ঘটেছিল উন্নতির জয়গান গাইতে গাইতেই। ওসমানী উদ্যানের গাছগুলো কোনোমতে রক্ষা পেয়েছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছগুলোও মনে হয় আপাত বাঁচবে। কারণ ঐ একই। জনমত। আড়িয়াল বিলও রক্ষা পেয়েছে জনমতের বিরুদ্ধতার কারণেই। কুষ্টিয়াতে লালনের আখড়াকে বিপদগ্রস্ত করে সেখানে একটি আধুনিক স্থাপনা গড়বার উদ্যোগকে প্রতিহত করা যায়নি, কারণ স্থানীয় জনমত গড়ে তোলা কঠিন ছিল। উন্নয়নের স্বার্থে সুন্দরবনের স্থায়ী ক্ষতিসাধনের যে চেষ্টা চলছে তাকেও থামানো যাচ্ছে না, কারণ উদ্বিগ্ন মানুষদের চেষ্টা সত্ত্বেও জনমতকে প্রবল করা সম্ভব হয়নি। আসলে রাষ্ট্র স্বয়ং যেখানে প্রতিপক্ষ সেখানে জনমত সৃষ্টি দুঃসাধ্য বইকি। গণমাধ্যমও সহযোগিতা করে না। লোভে ও ভয়ে।
প্রতি বছরের মতো এ বছরেও বিশ্ব সংবাদপত্র স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপিত হয়েছে এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কোন দেশে কী অবস্থায় আছে তার একটা সালতামামি যথারীতি দাখিল করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অবস্থানের নিম্নগামিতা অব্যাহত আছে; এবং ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এসে পৌঁছেছে ১৫২তমে। এই নামাটা যে থামবে এমন ভরসা কেউ দিতে পারছে না। ফেসবুকে দুঃসাহসীদের অনেকেই স্ট্যাটাস দিয়ে থাকে, এবং কেউ কেউ নিয়মমাফিক ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের থাবার মধ্যে পড়ে দুর্ভোগ পোহায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়। ভয় ভেতর থেকে চেপে ধরে। কণ্ঠরোধ করে। রক্ত শীতল করে দেয়। আশঙ্কা থাকে সরকার-সমর্থক কোনো উত্সাহী ব্যক্তি কখন না জানি দয়া করে থানায় গিয়ে একটা নালিশ ঠুকে দেন। তাহলেই কর্ম কাবাড়। মানহানির মামলা তো অপেক্ষমাণ আছেই, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অতি গুরুতর অভিযোগও উঠতে পারে। এই যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বৃক্ষনিধন অভিযান, এর বিরুদ্ধে যারা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী যে তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন সেই নামদানটা উপেক্ষণীয় নয়। সরকারের দৃষ্টিতে নাগরিকদের দেশপ্রেম যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী হয়ে পড়ে, দেশপ্রেম তাহলে প্রাণরক্ষা চেয়ে কার কাছে যাবে, কোন আদালতে? দেশপ্রেমের পক্ষে জনমতই-বা গড়ে উঠবে কোন সাহসে? মাননীয় মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন এখন যেটি উদ্যান, আগে সেটি ছিল ঘোড়দৌড়ের মাঠ, কিন্তু তিনি স্মরণে রাখেননি যে ঘোড়া দৌড়ের মাঠকে উদ্যানে পরিণত করার কাজে বঙ্গবন্ধুর কতটা আগ্রহ ছিল; যে গাছগুলো কাটবার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কুড়াল হাতে নিয়েছে, ৫০টি কেটেও ফেলেছে, সেগুলো রোপণ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই। বঙ্গবন্ধুই নিজেই কি তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী হয়ে গেলেন?
বাংলাদেশে উন্নতি যে হয়েছে তার কারিগর কে? কারিগর হচ্ছে শ্রম। মেহনতি মানুষের কঠিন শ্রম। অকাতরে তারা শ্রম দিয়েছে দেশের কলকারখানায় ও কৃষিতে; শ্রম বিক্রি করে টাকা এনেছে বিদেশ থেকে। যারা ধনী হয়েছে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতাটা শ্রম দানের ছিল না, ছিল কে কার আগে কত বড় হবে এবং সংগৃহীত (মূলত লুণ্ঠিত) সম্পদ কীভাবে ভোগ-উপভোগে খরচ ও নিরাপদে বিদেশে পাচার করা যায় তা নিয়ে। প্রতিযোগিতা ছিল না বিনিয়োগের ব্যাপারে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পরে কলকারখানা যা ছিল সেগুলোর অধিকাংশই রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে নেওয়া হলো, না নিয়ে অবশ্য উপায়ও ছিল না; কিন্তু সেখানে যাদেরকে বসানো হলো তাদের অধিকাংশেরই যোগ্যতা ছিল না সেগুলোকে চালু রাখার। আগ্রহও ছিল না। অনেকেই এসেছিল দলীয় আনুগত্যের সিঁড়ি বেয়ে। অব্যবস্থাপনা ও লুটপাট শুরু হয়ে গেল; দেখা গেল পাকিস্তান আমলে যেখানে সব শিল্পকারখানাই ছিল লাভজনক, বাংলাদেশ আমলে তারা সবাই দ্রুতই লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। অনেকগুলো বন্ধই হয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর। কর্মসংস্থান বাড়ল না। যাদের শ্রমে ভেতরে-ফাঁপা, উপরে-সুদৃশ্য এই উন্নতি, তারা কিন্তু উন্নতির সামান্যতম অংশও পেল না। শিল্প খাতে শ্রমিকের দুর্দশার ছবিটা মূর্ত হয়ে ওঠে রানা প্লাজা নামের পোশাক তৈরি শিল্পকারখানার দুর্ঘটনায় এক লহমায় এক হাজার ৩১৮ জন শ্রমিকের মৃতু্যর ও কয়েক হাজার মানুষের পঙ্গু হয়ে যাবার এবং দুর্ঘটনার আট বছর পরেও ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকাংশের কোনো ক্ষতিপূরণ না-পাওয়ার খবরটির মধ্য দিয়ে। এই ছবিও কিন্তু পূর্ণ সত্য বলছে না, সেটি পেতে হলে বিবেচনায় নিতে হবে অন্য একটি ঘটনাকে। সেটা হলো চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নির্মাণাধীন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের গুলিতে সাত জন শ্রমিকের মৃতু্য এবং অজ্ঞাত সংখ্যক শ্রমিকের আহত হওয়ার খবরটিকে। এপ্রিল ২০২১-এর ঘটনা। শ্রমিকেরা সমবেত হয়েছিল তাদের বকেয়া মজুরি ও রমজানের সময়ে ১০ ঘণ্টার পরিবর্তে আট শ্রমঘণ্টা প্রবর্তনের দাবিতে। বলাই বাহুল্য, শ্রমিকদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, তারা কোনো প্রকার ভাঙচুরও করেনি, তাদের কাজটা বেআইনিও ছিল না। কিন্তু মালিকের হয়ে শ্রমিকদেরকে ছত্রভঙ্গ করবার জন্য স্থানীয় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, পুলিশের করা মামলাতে অভিযুক্ত হয়েছে তারাই যারা পুলিশের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের দশাটা পালিয়ে বাঁচার।
সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা প্রকৃতির মরণব্যাধি করোনার কবলে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ জীবন অতিবাহিত করছি, তেমনি রাষ্ট্রের ও সরকারের নানা জনবিরোধী কর্মকাণ্ডেও অনিরাপদ ও ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছি। প্রশ্নটা তাই দাঁড়াচ্ছে আমরা তবে বাঁচবো কোন পথে? পথ যে নেই, তা-নয়। পথ ঐ একটিই, সমাজ-বিপ্লব। ওটি ছাড়া আমাদের সমষ্টিগত ভাবে বাঁচার এবং মুক্তির কোনো উপায় নেই। এটাই বাস্তবিক সত্য।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
