জাগতিক নিয়মে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিয়াছে আরো একবার। আসিয়াছে নূতন বৎসর। নূতন স্বপ্ন, নূতন ভাবনার পসরা লইয়া আসে নূতন বৎসর। জাতীয় জীবনে আমরা তিন প্রকারের নববর্ষ উদ্যাপন করিয়া থাকি। বঙ্গাব্দ, হিজরি ও খ্রিস্টাব্দের নববর্ষ। একটি আমাদের জাতিসত্তার সহিত সম্পৃক্ত, অন্যটি ধর্মীয় সত্তা এবং খ্রিস্টীয় নববর্ষটি জড়িত রাষ্ট্রীয় যাবতীয় কার্যক্রম ও কর্মকাণ্ডের সহিত। সেই দিক দিয়া খ্রিস্টাব্দের নববর্ষটি আমাদের জাতীয় জীবনে সবচাইতে বেশি ভূমিকা রাখে।
কেবল আমাদের নহে, পহেলা জানুয়ারির আবেদন বিশ্বব্যাপী সবচাইতে বেশি। যদিও নূতন বৎসর নূতন কিছু নহে। নূতন কোনো অকল্প বা বায়বীয় স্বপ্ন আমরা গোলাপি ডানায় ভর করিয়া পূরণ করিয়া ফেলিতে পারিব না। নূতন বৎসরের সূর্য আমাদের জন্য বিশেষ কোনো আলোকবার্তা পাঠাইবে না, শুরু হইবে না নূতন কোনো স্বপ্নযাত্রা। নূতন আলোয় ভাসিয়া যাইবে না কোথাও জমিয়া থাকা অন্ধকারও। তাহার পরও পহেলা জানুয়ারিতে যে নূতন বৎসর সূচিত হয়, তাহাতে তৈরি হয় নূতন কিছুর জন্য এক প্রকারের প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার একটি মনস্তাত্ত্বিক মূল্য রহিয়াছে বটে। আমরা পুরাতন বৎসরের সালতামামি তৈরি করি, অপূর্ণ স্বপ্নকে নূতন করিয়া পূরণের আশার ভেলায়ও চড়ি। তবে সেই মুহূর্তে আমরা একটি নূতন বৎসরে পা রাখিলাম, সেই মুহূর্তে সমগ্র বিশ্বই এক নিদারুণ সংকটকাল অতিবাহিত করিতেছে। মহামারি করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবলীলায় গত প্রায় দুই বৎসর ধরিয়া বিশ্ব জুড়িয়া অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা সকল কিছুতেই টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করিয়াছে। করোনার এই ধাক্কা সামলাইয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন ঘুরিয়া দাঁড়াইতে আরম্ভ করিয়াছিল সেই সময়ই নূতন করিয়া করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের চোখরাঙানিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনরায় স্থবিরতা নামিয়া আসার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। এই আধুনিক যুগে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ হইয়া থাকে সংশ্লিষ্ট দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার ভিতর দিয়া। বিশ্ব এখন বিশ্বগ্রাম বিধায় বিশ্বের বড় অর্থনীতিতে ঢেউ উঠিলে তাহা সকলকেই আঘাত করে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করিতেছেন, করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের তাণ্ডব অব্যাহত থাকিলে নূতন বৎসরে বিশ্ব জুড়িয়া কাঁচামাল হইতে শুরু করিয়া জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতিসহ বিভিন্ন প্রকারের অর্থনৈতিক সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করিতে পারে। তবে এই সকল আশঙ্কার মাঝেই লন্ডনভিত্তিক অর্থনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) পূর্বাভাস দিয়াছে, এই বৎসর বৈশ্বিক অর্থনীতির আকার প্রথমবারের মতো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াইবে, যাহা নিঃসন্দেহে আশার বাণী। করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই প্রভাব পড়িবে বলিয়া তাহারা জানাইলেও করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হইবে এবং বিশ্ব তাহা কীভাবে মোকাবিলা করিবে তাহার উপরও আগামী দিনের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করিবে।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ম্যান প্রোপোজেস বাট গড ডিজপোজেস। অর্থাত্ মানুষ ভাবে এক, কিন্তু হয় আরেক। গত বৎসরের শুরুতে আমরা জানিতাম না, আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করিতেছে। আজকে নূতন বৎসরের প্রথম দিনেও একইভাবে আমরা জানি না—আমাদের অদৃষ্টে কী আছে। তবে নূতন কিছু মানেই নূতন আশাবাদ। সুতরাং আমরা আশায় বুক বাঁধিতেই পারি—গত বৎসরের বিপদ-আপদ হইতে নূতন বৎসরে আমরা ক্রমশ মুক্তির পথে ধাবিত হইব।
