রিয়াদ হোসেন
আমদানি-রপ্তানি কিংবা যাত্রীদের কাছ থেকে অবৈধ ও চোরাচালানের মালামাল আটক করার ক্ষেত্রে কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিজিবি, পুলিশসহ অন্য সংস্থার সঙ্গে মাঝে মাঝেই মতবিরোধ হয়ে থাকে। এসব ঘটনা অতীতে তিক্ত অভিজ্ঞতারও জন্ম দিয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে পুনর্গঠিত চোরাচালান নিরোধ জাতীয় টাস্কফোর্স সম্প্রতি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুল্ক এলাকার মধ্যে যে কোন ধরনের চোরাচালান কিংবা অবৈধ মালামাল আটক করবে কেবল শুল্ক বিভাগ। অন্য সংস্থার কাছে তথ্য থাকলে তারা শুল্ক বিভাগকে তা জানাবে। তবে শুল্ক এরিয়া পার হওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য বিভাগ মালামাল আটক করতে পারবে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রী চিহ্নিত করতে বেনাপোল ইমিগ্রেশনের সাথে কাস্টমস, মাদ্রক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিজিবি একসাথে তথ্য লিপিবদ্ধ করা ও তা শেয়ার করার সিদ্ধান্তও হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গত ৩০ জানুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে চোরাচালান বিরোধী কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়ার সভাপতিত্বে ওই সভায় বিজিবি, পুলিশ, আনসার-ভিডিপি ছাড়াও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি ও বিভাগীয় কমিশনাররা অংশ নেন। সভায় সীমান্ত এলাকাসহ দেশব্যাপী মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধ চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে ১৯টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গত প্রায় তিন মাস আগে সিলেটের তামাবিল সীমান্ত এলাকায় তল্লাশি ইস্যুতে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিজিবি’র কর্মকর্তাদের বচসা হয়। ওই ঘটনার জেরে বিজিবি’র সদস্যদের হাতে দুইজন শুল্ক কর্মকর্তা মারধরের শিকার হয়েছেন বলে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা অভিযোগ তোলেন। এর জেরে তামাবিলে শুল্ক কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির ঘটনাও ঘটে। ওই ঘটনায় তখন স্বরাষ্ট্র সচিবকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া।
টাস্কফোর্সের সভায় খুলনার বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া চোরাচালান রোধে আন্তঃসংস্থাগুলোর মধ্যে ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব’ কমিয়ে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করার উপর গুরুত্ব দেন। একই সভায় এনবিআর সদস্য শাহনাজ পারভীন বিদ্যমান শুল্ক আইনের বিধান স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, কাস্টমস বন্ডেড এলাকায় শুধুমাত্র কাস্টমস কর্তৃপক্ষই চোরাচালান নিরোধ ও শুল্ক সংক্রান্ত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে। তিনি বলেন, সব সংস্থা আইন মেনে চললে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব সংক্রান্ত কোন সমস্যার উদ্ভব হবে না। এ সময় এনবিআর সদস্য খন্দকার আমিনুর রহমান বলেন, অন্য কোন সংস্থার কাছে তথ্য থাকলে তা শুল্ক বিভাগের কাছে সরবরাহ করবে। শুল্ক এরিয়ার মধ্যে উক্ত চোরাচালানকৃত পণ্য আটক করা সম্ভব না হলে ওই এরিয়া পার হওয়ার পরই বিজিবি বা অন্য কোন সংস্থা আটক করবে। এ সময় বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা চোরাচালানের কারণ, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও তা রোধে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে প্রতিমাসে টাস্কফোর্স চারটি অভিযান পরিচালনা করবে এবং ভারত থেকে আগত ট্রেনে চোরাচালান রোধে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা হবে। ভারত থেকে আগত ট্রেনে যৌক্তিক কারণ ছাড়া গতি কমানো যাবে না এবং গন্তব্যস্থলের আগে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোথাও দরজা খোলা যাবে না। কাস্টমস বন্ডেড এলাকায় চোরাচালান সংক্রান্ত কোন তথ্য অন্য সংস্থার কাছে থাকলে তা কাস্টমস বিভাগকে অবহিত করবে। আটককৃত পণ্যের মূল্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পণ্য বা সমজাতীয় পণ্যের আমদানি মূল্য উল্লেখ করতে হবে। এছাড়া গবাদি পশুর সাথে মাদক চোরাচালান রোধে সীমান্তবর্তী এলাকায় পশুর বিট বা খাটালের অনুমোদন সীমিত করা, বৈধ মালামালও মাদক হিসেবে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, মোবাইল কোর্ট সংক্রান্ত রিট মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চোরাচালান রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জনবল বাড়ানো, মাদক ও চোরাচালান সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, প্রত্যেক বিভাগে শিগগিরই রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা, চোরাচালান সংক্রান্ত মামলার তথ্য স্পর্শকাতর মামলা হিসেবে প্রতিমাসে কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের কাছে পাঠানো ও ইয়াবা চোরাচালান রোধে কক্সবাজার সীমান্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তত্পর রাখারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
