যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানত দুইটি কাজ রহিয়াছে। প্রথমত, শিক্ষাদান; দ্বিতীয়ত, শিক্ষাদানের জন্য নূতন নূতন জ্ঞানের উদ্ভাবন। একটিকে বাদ দিয়া আরেকটি চলে না। এই জন্য আমরা দেখিতে পাই, উন্নত বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় হেন কোনো বিষয় নাই, যাহা লইয়া সুগভীর গবেষণা করে না। গবেষণার সংস্কৃতি সেইখানে এতটাই অধিক যে, বিভিন্ন বিষয়ে সেই সকল উন্নত দেশে রহিয়াছে অসংখ্য থিংক ট্যাংক। এই জন্য ওয়াশিংটন ডিসিতে আমরা দেখিতে পাই সংখ্যাতীত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান।
প্রকৃতপক্ষে গবেষণা ব্যতীত আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের জগতে মানবজাতি এক অর্থে অন্ধ। উন্নত দেশগুলি গবেষণায় জোর দিয়া থাকে বলিয়াই তাহারা উন্নতির গ্রাফ ধরিয়া রাখিতে পারে। সুতরাং আমাদের দেশেও একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সবচাইতে অধিক জোর দেওয়া উচিত গবেষণায়। সেই অনুযায়ী পূর্বেই তাহাদের পরিকল্পনা করিবার নিয়ম। অনেক গবেষক অবশ্য অভিযোগ করেন, দেশে পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল ডিগ্রিতে খুবই অল্প বাজেট দেওয়া হয়। ইহার ফলে যাহারা বিদেশে যাইতে পারেন, চলিয়া যান। আর দেশে যাহারা থাকেন তাহারা গবেষণায় উত্সাহিত হন না। এই জন্য দেখা যাইতেছে—দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, তত্ত্ব উদ্ভাবনে, আবিষ্কারে যোজন পথ পিছাইয়া রহিয়াছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় আইনে গবেষণা বাধ্যতামূলক করা হইলেও তাহা মানিতেছে খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ই। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে গবেষণা লইয়াও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে করুণ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে। ইউজিসির প্রতিবেদনে দেখা গিয়াছে, দেশে সরকারি-বেসরকারি ১৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টি ২০২০ সালে গবেষণা খাতে এক টাকাও ব্যয় করে নাই। মাত্র ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করিয়াছে ৪৪টি বিশ্ববিদ্যালয়। একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও বত্সর জুড়িয়া দুই-চারটি প্রকাশনা ছাড়া অন্য কোনো গবেষণা করে নাই। যদিও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে বিপুল ব্যয় করিয়াছে। তবে সিংহভাগ বেসরকারি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকে সবচাইতে কম গুরুত্ব দিয়াছে। অনেকে অবশ্য মনে করেন, গবেষণা খাতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের এই দৈন্যচিত্রের জন্য কেবল বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষক দায়ী নহেন। দেশের সকল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই মূলত ‘শিক্ষণ’ (টিচিং) বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রছাত্রীদের পড়াইয়া চাকুরির বাজারের উপযোগী গ্র্যাজুয়েট সৃষ্টির লক্ষ্যেই যেন এই সকল প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হইয়াছে! শুধু বাংলাদেশ নহে, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই এই চিত্র দেখা যায়। ইতিপূর্বে প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, গবেষণার জন্য আমাদের ফান্ড রহিয়াছে, বিশেষ ফান্ড রহিয়াছে; তবুও কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার জন্য অনীহা—তাহা তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বুঝিতে পারেন না।
আমরা ইহার পাশাপাশি বলিতে পারি যে, বাজেট বরাদ্দের পর তাহা যথাযথভাবে ও সময়মতো ব্যয় করিবার অক্ষমতা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ক্ষেত্রেই নহে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকল্পেও ইহা দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আরো দুইটি কারণ আমরা উল্লেখ করিতে পারি। প্রথমত, বাংলাদেশে গবেষণার সংস্কৃতি সেইভাবে গড়িয়া উঠে নাই। দ্বিতীয়ত, সমাজে গবেষণা ও গবেষকের যথাযথ মূল্যায়ন নাই। ইহার জন্য কেবল শিক্ষক নহেন, সমাজ, সরকার, রাষ্ট্রসহ সকলেই কমবেশি দায়ী। আরেকটি বিষয় হইল, পিএইচডি ডিগ্রি ব্যতীত যেইখানে বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগই সম্ভব নহে, সেইখানে বাংলাদেশে অনেকে পিএইচডি ডিগ্রি না করিয়াও অধ্যাপক হইতে পারিতেছেন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণা প্রবন্ধ বা প্রকাশনার শর্ত রহিয়াছে বটে; কিন্তু অনেক জায়গাতেই ইহা উপেক্ষিত হইতেছে। আবার কোথাও একই প্রকাশনা বারবার দেখাইয়া পদোন্নতি লইবার অভিযোগ আছে। এমনকি অনেক গবেষকের গবেষণা প্রবন্ধের ক্ষেত্রে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আছে। মনে রাখিতে হইবে, গবেষণা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে দেশকে নূতন পথ দেখানো এবং জাতিকে জ্ঞানবিজ্ঞানের উচ্চ শিখরে আসীন করিবার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের স্কন্ধেই অর্পিত হইয়াছে। বর্তমান বিশ্ব জ্ঞানভিত্তিক। যেই দেশ যত অধিক প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন করিতে পারিবে; তাহারাই প্রতিযোগিতামূলক সমকালীন বিশ্বে উন্নতি করিতে পারিবে। উন্নত দেশ গঠনের ইহাও একটি শর্ত।
