বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছে। এটা গর্বের, অহংকার এবং আনন্দের। কয়েক যুগ ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে অস্বস্তিকর এবং বিশৃঙ্খল অবস্থায় বিরাজমান। জনগণের মধ্যেও ভয়-ভীতি, ক্ষোভ, চিকিৎসক এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার কমতি নাই। ২০২০ সালের মার্চ থেকে করোনায় এক দিকে যেমন চলেছে ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা, অন্য দিকে উন্মোচিত হয়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অনেক নগ্ন দিক। শুরুতে সংবাদপত্রের পাতা খুললেই দেখা যায় স্বাস্থ্য-সুরক্ষা সামগ্রীর সংকট, হাসপাতালে হাই-ফ্লো অক্সিজেন এবং আইসিইউর অভাব, পর্যাপ্ত বেড নাই, বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে ভর্তি হতে না পেরে রাস্তাতেই করোনা রোগীর মৃত্যু, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে জনসমাগম, স্বাস্থ্য খাতে ও ব্যবস্থাপনায় নানা দুর্নীতি ইত্যাদি।
বঙ্গবন্ধু দেশেই স্নাতকোত্তর পর্যায়ে চিকিৎসকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিকমানের বিশেষজ্ঞ তৈরির জন্য তত্কালীন শাহবাগ হোটেলকে ‘আইপিজিএম অ্যান্ড আর’ এবং ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ কলেজ ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স বা বিসিপিএস প্রতিষ্ঠা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইপিজিএম অ্যান্ড আর’কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর করেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করেন নিটোর বা পঙ্গু হাসপাতাল এবং প্লাস্টিক সার্জারিরও কার্যক্রম শুরু হয়। ফিজিওথেরাপি নিশ্চিত করতে তিনি ১৯৭২ সালে এ বিষয়ে উচ্চতর কোর্স ও চিকিৎসা সেবা চালু করেন। এ ছাড়া তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল এবং তত্কালীন কলেরা হাসপাতালকে আইসিডিডিআর.বি হিসেবে রূপান্তরিত করেন। মেডিক্যাল ছাত্রদের পাশাপাশি প্যারামেডিক্যাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বঙ্গবন্ধুর সময় শুরু হয়েছিল। ‘প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধ শ্রেয়’-এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম) এবং চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গবেষণার প্রচলন, মান নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি) প্রতিষ্ঠা করেন। জনবিস্ফোরণের বিষয়টি উপলব্ধি করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তিনি পরিবার-পরিকল্পনা দফতর স্থাপন করেন। ১৯৭৪ সালে ‘জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান’ এবং ১৯৭৫ ‘বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ’ গঠিত হয় তার নির্দেশনায়।
কয়েক দশক ধরে চিকিৎসাসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সীমাবদ্ধ সম্পদ, দারিদ্র্য, জনসংখ্যার আধিক্য ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অর্জন কম নয়। স্বাস্থ্যবিষয়ক সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসিত হয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। শুরুতে করোনা প্রতিরোধের সংকট ছিল, তবে বর্তমানে বাংলাদেশের সফলতা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। বাংলাদেশ পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস, সেনিটাইজারসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপকরণ উৎপাদনে সক্ষম হয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে সারা বিশ্বে রপ্তানি করেছে। শুরুতে করোনা পরীক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে তার সমাধান হয়েছে। অনেক বাধা-বিপত্তি এবং অব্যবস্থাপনা পেরিয়ে বেশ কিছু কোভিড ডেডিকেটেড ও ফিল্ড হাসপাতাল, আইসিইউ এবং হাই-ফ্লো অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সহজলভ্য ও নিশ্চিত করা হয়েছে।
দেশের সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার নেটওয়ার্ক। ‘১৬২৬৩’ নম্বর ব্যবহার করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত তথ্য প্রদান এবং ৯৫টি হাসপাতালে টেলিমেডিসিন সেবা চালু হয়েছে। ২০১১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশকে ‘ডিজিটাল হেলথ ফর ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। জনবল বৃদ্ধি, অবকাঠামোর উন্নয়ন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক বাংলাদেশকে পোলিও ও ধনুষ্টংকারমুক্ত ঘোষণা, ওষুধের সরবরাহ বৃদ্ধি, উন্নত শিশুস্বাস্থ্য সেবা, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা, চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের জন্য ফ্রি চিকিৎসা ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবার উন্নয়নে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন, নতুন হাসপাতাল চালুসহ উন্নয়নমূলক অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। মহিলা, শিশু ও সুবিধাবঞ্চিতদের সেবা প্রাপ্তির সহজলভ্যতা এবং স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেবাসমূহের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস এবং পুষ্টিমান বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। শিশু, নবজাতক এবং মাতৃমৃত্যু হার অনেক কম। ইপিআই-এর মাধ্যমে টিকা কার্যক্রমের সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭ শতাংশে হ্রাস, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার ৬২.৪ শতাংশে উন্নীত এবং সন্তান জন্মদানের হার ২.০৫-এ হ্রাস পেয়েছে। ‘১৬৭৬৭’ নম্বর ব্যবহার করে ‘সুখী পরিবার’ সেবায় প্রদান করা হচ্ছে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারাদেশে ১৩ হাজার ৭৭৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং আরো ৪ হাজার ৫০০টি চালু করা হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে বহু হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে এবং শতাধিক সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল চালু রয়েছে। অনেক বিশেষায়িত হাসপাতালে বিনা মূল্যে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, প্রসূতিসেবা, অর্থোপেডিক, চোখ, নাক-কান-গলা, হূদরোগ, নবজাতক ও অপুষ্টিজনিত সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি, কুষ্ঠ ও অন্যান্য রোগের জন্য ১৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল ছাড়াও সব মেডিক্যাল কলেজ, জাতীয় হূদরোগ এবং অনেক জেলা হাসপাতালে ‘সিসিইউ’-এর চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে। এছাড়াও ১০টি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট চালু এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজগুলোর জন্য আসন এবং সরকারি হাসপাতালে শঘ্যা বাড়ানো হয়েছে। ১৩টি বেসরকারি হোমিওপ্যাথি মেডিক্যাল কলেজ, সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল অফিসার ও প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নতুন অনেক ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে, যেমন—শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স, অত্যাধুনিক ক্যানসার ও জাতীয় কিডনি হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, জাতীয় হূদরোগ ও পঙ্গু হাসপাতালের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, অ্যাজমা সেন্টার ও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালকে সরকারি হাসপাতালে রূপান্তর, মুগদায় ৫০০ শঘ্যার হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইএনটি হাসপাতাল, জাতীয় নার্সিং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, বক্ষব্যাধি ও কুর্মিটোলা ৫০০ শঘ্যাবিশিষ্ট এবং ঢাকার ফুলবাড়িয়ায় সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, খুলনার আবু নাসের বিশেষায়িত ও গোপালগঞ্জের শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল এবং এই হাসপাতালকে কেন্দ্র করে অনলাইন চক্ষুসেবা কার্যক্রম চালু করতে ‘ভিশন সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ২০২১ সালে ৫ বিভাগের ২০টি জেলার ৭০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ‘কমিউনিটি ভিশন সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি সেন্টারে প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেজ হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে রোগীর যাবতীয় তথ্য পাঠিয়ে ও রোগীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চক্ষু বিশেষজ্ঞগণ চিকিৎসা দেন। সারাদেশে পর্যায়ক্রমে সব উপজেলায় আরো সেন্টার স্থাপন করা হবে। আগে যেসব রোগে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়াও হতো, বর্তমানে এসব রোগের চিকিৎসা দেশেই হচ্ছে। ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা যথেষ্ট কম খরচেই হচ্ছে।
অনেক প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন, যা সম্পন্ন হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আরো যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটবে। যেমন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল নির্মাণ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজকে ৫ হাজার শঘ্যায় ও জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালকে ১ হাজার ৫০০ শঘ্যায় উন্নীতকরণ। সারা দেশে জেলা হাসপাতালগুলোতে ১০ তলাবিশিষ্ট ক্যানসার, কিডনি এবং হূদ্রোগ ব্যবস্থাসংবলিত হাসপাতাল নির্মাণ, প্রতিটি উপজেলায় ৫০ শঘ্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল এবং ৯৭টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ চলছে। আরো কয়েক হাজার চিকিৎসক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত পাঁচ বছরমেয়াদি ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কর্মসূচি ২০১৭-২০২২’-এর কাজ শুরু হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি পরিস্হিতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আশাতীতভাবে অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলছে।
লেখক: প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক

ভালো গবেষণা ছাড়া দেশ কী করিয়া উন্নত হইবে?
ক্ষতিপূরণ পেতে বড় বাধা আইনি জটিলতা