বিধিমালার দুর্বলতায় আত্তীকরণবঞ্চিত বহুজন

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:০৭

প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রতি উপজেলায় একটি করে স্কুল-কলেজ জাতীয়করণের মহাপরিকল্পনা ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার। সে লক্ষ্যে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৪৬টি কলেজ জাতীয়করণ করা হয়েছে। ‘জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-২০০০’ অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীরা আত্তীকৃত হয়েছেন। কিন্তু উক্ত বিধিমালাটি নানান বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বলা যায়, বিধিটি ছিল শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার নীলনকশা। কারণ এই বিধির কোনো আইনগত ভিত্তিই ছিল না।

আত্তীকরণ বিধিমালা ১৯৮১ ও ১৯৯৮ নীতি অনুযায়ী অতীতে দেশের বহু শিক্ষক-কর্মচারী দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে যোগ্যতা যাচাইপূর্বক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় ১৯৯৮ সালের ঠিক দুই বছর পরই অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ‘জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-২০০০’ নামকরণে এই কালো আইনটি প্রণীত হয়। এই বিধিটি শিক্ষকদের বৈষম্য এবং হয়রানি করার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। বিধির ২ (গ) উপধারাটি ছিল শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। যেখানে ডিগ্রি কলেজের বহু অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন অধ্যক্ষকে প্রভাষক পদে নামিয়ে আনাসহ চাকরিকাল ৫০ শতাংশ ধরে আত্তীকৃত হওয়ার আইন ছিল। অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যাপকদের পিএসসির নিয়োগকৃত সর্বশেষ ব্যাচের জুনিয়র ক্যাডার কর্মকর্তার নিচে অনুশাসন জারি করাসহ আরো নানান বিষয়ে শিক্ষকদের মর্যাদা ও মানবিক অধিকার বিনষ্ট করার বিধান ছিল।

২০০০ বিধির সবচেয়ে হাস্যকর বিধানটি ছিল—শিক্ষকদের এসএসসি এবং এইচএসসির রেজাল্ট বিবেচ্য ছিল না। শুধু প্রভাষকদের স্নাতক সম্মানে দ্বিতীয় শ্রেণি ও পাসকোর্সের শিক্ষকদের মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণি এবং প্রদর্শকদের ক্ষেত্রে বিএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগ থাকলেই নিয়ম অনুযায়ী আত্তীকৃত হবেন। কিন্তু অত্যন্ত মর্মান্তিক বিষয় ২০০০ বিধিতে জাতীয়করণ হওয়া কলেজের একজন প্রভাষক বা প্রদর্শক ২৫ থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত শিক্ষাদান দিয়ে এলেও তিনি অনার্সে তৃতীয় বিভাগপ্রাপ্ত হবার কারণে কিংবা যত ভালো রেজাল্টই হোক না কেন পাসকোর্সের শিক্ষকদের মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণি না থাকার কারণে সব অভিজ্ঞ শিক্ষকদের আত্তীকরণ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিশ্বের কোনো সভ্য সমাজে শিক্ষকদের নিয়ে এমন হেনস্তা করার নজির নেই। শিক্ষকরা হলো সমাজের বিবেক। মূল্যবোধ বিনির্মাণের রূপকার। সমাজে জ্ঞান বিস্তার ও নৈতিক চেতনা জাগ্রত করার মহান কারিগর। অথচ সেই শিক্ষাগুরুরা তাদের সামাজিক মর্যাদা হারিয়ে জ্ঞানের বিশুদ্ধ উদ্যান ছেড়ে বিতর্কিত ২০০০ বিধির ছোবলে রাজপথে নেমেছেন। কখনো প্রেসক্লাবের সামনে একাধিকবার মানববন্ধন করেছেন। অনেকে ভিটে মাটি বিক্রি করে আদালতপাড়ায় নেমেছেন, যা শিক্ষাব্যবস্থায় আতঙ্কজনক পূর্বাভাস।

বিষয়টি অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে দ্রুতই বিতর্কিত ২০০০ বিধিমালা বিলুপ্ত করে ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক অশিক্ষক কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-২০১৮’ নামকরণে নতুন বিধিমালা প্রণীত করেন, যা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গৌরবান্বিত অধ্যায়ের সূচনা করেছে। উক্ত বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে দেশে আরো ৩৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের নামে জিও জারি করা হয় এবং পদ সৃজনের কাজও সমাপ্ত হওয়ার পথে। আশার কথা, উক্ত বিধিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র এসআরও নম্বর ২৪৫-আইন/২০১৮ ৩১ জুলাই ২০১৮ খ্রি. জারিকৃত ১৫ নম্বর ২(খ) উপবিধিতে বিতর্কিত আত্তীকরণ ২০০০ বিধিমালা থেকে তথাকথিত কাম্য যোগ্যতার অজুহাতে বঞ্চিত শিক্ষকদের আত্তীকরণের সুযোগ রাখা হয়। যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার যুগান্তকারী ও মানবিক পদক্ষেপ। শিক্ষকরা অনেক আশায় বুক বেঁধে সব আন্দোলন স্থগিত করে এমনকি মামলা প্রত্যাহার করে নতুন স্বপ্নে বিভোর হন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এত সব অর্জন কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তার অবহেলার কারণে ম্লান হবার পথে। নতুন জারিকৃত ২০১৮ বিধির ১৫ নম্বর ২(খ) উপবিধি অনুযায়ী বঞ্চিত শিক্ষকদের আত্তীকরণের জন্য স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষবৃন্দ সচিব বরাবর আবেদনপত্র জমা দেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় উচ্চ পর্যায়ের জোর সুপারিশ ও তদবিরে ৫/৬টি কলেজের শিক্ষকবৃন্দের আত্তীকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলেও বাকি কলেজের শিক্ষক-অশিক্ষকবৃন্দ সেই ২০১৮ সাল থেকেই ঝুলে আছেন। দূরদূরান্ত থেকে আগত শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতি মাসেই আত্তীকরণের কাজ শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই আত্তীকরণবঞ্চিত বহু শিক্ষক হতাশা, আর্থিক দীনতা আর সীমাহীন আফসোস নিয়ে চাকরিকাল শেষ করেছেন। অনেকে আত্তীকরণবঞ্চিত হওয়ার অপবাদ বুকে নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেকের চাকরিকাল শেষ হওয়ার পথে।

আইন তো মানুষের জন্য। সমাজের কল্যাণের জন্য। বিতর্কিত আইন অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করে কখনো মানবতাকে রক্ষা করা যায় না। দয়াভিক্ষা নয়—কারো করুণায় নয়; চির উন্নত শিক্ষাগুরুর মর্যাদা নিয়ে তারা বাঁচতে চান। প্রাপ্য অধিকার ফিরে পেতে চান। এসব শিক্ষক দীর্ঘশ্বাস আর হতাশা বুকে নিয়ে এমনকি আর্থিক টানাপড়েনের ভেতর জীবনযাপন করে চলেছেন। যার প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীর ওপর। আত্তীকরণবঞ্চিত শিক্ষকরা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন তো বটেই, একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেও প্রতিনিয়ত চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তাদের নীরব আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছে জ্ঞানের বিশুদ্ধ উদ্যান। তাদের বিষয়টি দেখার যেন দেশে কেউ নেই।

প্রধানমন্ত্রীর চিন্তা ও কর্মের বাস্তবায়নে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা দৃশ্যমান হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তার ক্যারিজম্যাটিক নেতৃত্বে দেশ ও জাতি বারবার মহাসংকট থেকে মুক্তি পেয়েছে। তিনি জাতির সামনে আবিভূ‌র্ত হয়েছেন শোষিত মানুষের মুক্তির অগ্রদূত হয়ে, কখনো মানবতার জননীরূপে; আবার কখনো মাদার অব এডুকেশন উপাধি পেয়ে জাতিকে গর্বিত করেছেন। তার মতো বিশ্বনন্দিত নেতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার একজন খাঁটি বাঙালি পেয়ে গোটা জাতি যেন গর্বিত। অসহায় বঞ্চিত শিক্ষকদের প্রাণের দাবি, প্রধানমন্ত্রী যেন মানবিক দিক বিবেচনা করে অতি দ্রুত বিষয়টি নিষ্পত্তি করার সিদ্ধান্ত নেন।

লেখক: শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন