প্রাইভেট সেক্টর একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে প্রাইভেট সেক্টরের বিভিন্ন সংস্থা ব্যবসায় পরিচালনা এবং উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখিবার জন্য ব্যাংক হইতে ঋণ লইয়া থাকে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমায় তাহা পরিশোধ করিবার বাধ্যবাধকতাও থাকে। দেশের কিংবা আন্তর্জাতিক যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাক কিংবা সংকটে উৎপাদন কার্যক্রম তথা পণ্য তৈরি এবং বিক্রি কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হইলে প্রাইভেট সেক্টরের এই সকল সংস্থা হয়তো নির্দিষ্ট সময়ে ঋণের অর্থ পরিশোধ করিতে পারেন না। কিন্তু দেখা যায়, অনিবার্য কারণবশত প্রাইভেট সেক্টরের ঋণের অর্থ পরিশোধে বিলম্ব ঘটিলে সেই সকল প্রতিষ্ঠানকে ঋণখেলাপি ঘোষণা করিবার হুমকি আসে। অথচ পাবলিক সেক্টর অর্থাৎ সরকারি বিভিন্ন প্রজেক্ট এবং ব্যবসায় কার্যক্রমে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বারবার অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হইয়া থাকে, তাহা সত্ত্বেও এই সকল খাত হইতে কখনো লাভের মুখ দেখিয়াছে সরকার, সেই দৃষ্টান্ত খুঁজিয়াও পাওয়া যাইবে না। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহে কেবল সরকারি খাতেরই যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকাইয়া রহিয়াছে, সেই অর্থ ফেরত পাইবার উদ্যোগ লইবে কে? কিংবা আদৌ ফেরত না পাইলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে?
আমরা দেখিতে পাই, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বেসরকারি খাতে ব্যবসায় পরিচালনায় নানাবিধ প্রতিকূলতা সামলাইতে হয়। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা হইতে যে কোনো ছোটখাটো নির্দেশনা কিংবা সিদ্ধান্ত পাইবার বেলায়ও সীমাহীন দুর্ভোগ এবং দীর্ঘসূত্রিতার মুখোমুখি হইতে হয়। ইহার পাশাপাশি উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখিবার জন্য কলকারখানাগুলির স্ট্যাবিলিটি প্রয়োজন হয়, সেইখানে গ্যাস কিংবা বিদ্যুতের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিলে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হইয়া থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলির নীতিনির্ধারকগণ বড় গলায় বলিয়া থাকেন, দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়াইয়া গিয়াছে, অথচ শিল্প-কলকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যার কারণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হয় না। সেই সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোক্তাগণকে মুখোমুখি হইতে হয় সরকারি নানাবিধ অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার। ইহার ফলে তাহাদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হইবার কারণে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে বিলম্ব ঘটিয়া থাকে; অথচ তাহাদের এই সকল সংকট আর প্রতিকূলতাকে আমলে নেওয়া হয় না। একজন সম্মানিত উদ্যোক্তা একবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে বলিয়াছিলেন, আপনার একজন প্রতিনিধিকে আমাদের কারখানায় পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়োগ দেওয়া হউক, তাহার সকল খরচও বহন করিব আমরা। কিন্তু ঐ প্রস্তাবের যথাযথ সদুত্তর মিলে নাই। অন্যদিকে সরকারি বিভিন্ন খাত এবং অবকাঠামো ব্যতীত বিভিন্ন প্রজেক্টের দিকে দৃষ্টি রাখিলে দেখা যাইবে, সেইখানে শুরুতে যেই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হইয়া থাকে, ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে তাহা বেশ কয়েক বার পরিবর্তন হয় এবং বারবার অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হইলেও সেই সকল খাত হইতে কখনোই লাভের মুখ দেখা যায় না। উন্নয়নশীল একটি দেশের রেলব্যবস্থা লইয়া বিশ্বব্যাংক একবার বলিয়াছিল, যে সকল রেললাইন অলাভজনক তাহা বন্ধ করিয়া দেওয়াই শ্রেয়। অথচ লাভের হিসাবে লবডঙ্কা হইলেও সেই সকল দেশের নীতিনির্ধারকগণ গলাবাজি করিতে ছাড়েন না। অদ্ভুত ব্যাপার হইল, রাষ্ট্রও অবগত রহিয়াছে, তাহারা এই সকল খাত হইতে মুনাফা করিতে পারেন না; এবং তাহারা ইহাও জানেন, কী কী কারণে এই সমস্ত খাত সঠিকভাবে চালানো সম্ভব হয় না।
উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতির সিংগভাগই রাষ্ট্রের নিজের, অর্থাৎ সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে; প্রাইভেট সেক্টর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিলেও তাহাদের আকার রাষ্ট্রের তুলনায় যৎসামান্যই। পাবলিক হউক, প্রাইভেট হউক সবটাই জনগণের অর্থ। ঋণ লইয়া যাহারা ঋণের অর্থ ফেরত দিবে না, তাহাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে—ইহা লইয়া কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নাই আমাদের মধ্যে। কিন্তু যেইখানে সরকারি খাতের বিভিন্ন সংস্থা স্বাভাবিক পরিস্হিতিতেই মুনাফার মুখ দেখিতে পারে না, সেইখানে সংকট-দুর্যোগ দুর্বিপাকের মধ্যেও বেসরকারি খাতকে চাপ সৃষ্টি করিবার কিংবা প্রশ্ন তুলিবার নৈতিক অধিকার তাহাদের রহিয়াছে কি না, সেই প্রশ্ন থাকিয়া যায়।
