সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অঙ্গীকার

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৪৩

দিনটি ছিল মাথানত না করার। শহরের পথে-প্রান্তে দেখা গেছে বর্ণমালার মিছিল। নারী-শিশু কিংবা পুরুষের হাতে হাতে অহংকার নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে মমতামাখা শোলার তৈরি অক্ষরগুলো। একুশের প্রভাতফেরীতে নিবেদিত ফুলের সঙ্গে ঠাঁই করে নিয়েছিল মাতৃভাষার স্মারকসমূহ। এরপর রাত পেরিয়ে ভোর, সকাল দুপুর বিকাল সন্ধ্যা-দিনভর উচ্চারিত হয়েছে ভাষার চেতনায় জ্বলে ওঠা অমর একুশে ফেব্রুয়ারির জয়গান। সেই চেতনার বিচ্ছুরণ ছড়িয়েছে রাজধানীসহ সারাদেশে। বসন্তের ঝলমলে দিনে এভাবেই প্রকাশিত হয়েছে বাংলা বর্ণমালার গৌরবময়তা। বায়ান্নর ভাষা শহীদদের রক্তঋণের শোকগাথা পরিণত হয়েছে প্রেরণার উেস। জাতিসত্তার চেতনাস্নাত মহান শহীদ দিবস         ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার এবং বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবি উচ্চারিত হয়েছে। একই সঙ্গে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ভাষা শহীদদের স্মরণ করেছে সমগ্র জাতি।

গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা শহীদদের বুকের রক্তভেজা সেই দিন। দিবসটিতে সকাল থেকে রাত অবধি একুশের মর্মবাণী প্রতিধ্বনিত হয়েছে বাঙালির হূদয়ের গহীনে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়েছে বর্ণমালার জন্য প্রাণ সঁপে দেওয়া ভাষাশহীদদের। ভাষা আন্দোলনের স্মারক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেমে এসেছিল শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে আসা মানুষের জনস্রোত। রাজধানীর সব পথ মিশে গিয়েছিল এই স্মৃতির মিনারে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে যারা জীবন উত্সর্গ করেছেন, বিনম্র ফুলেল শ্রদ্ধায় তাদের স্মরণ করছে বাংলাদেশ। সারাদেশে নানা আনুষ্ঠানিকতার মাঝে একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় নেপথ্যে বেজে ওঠে অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। ভাষাযোদ্ধাদের নিবেদিত পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ শেষে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী।  রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিবর্গ ও দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুনরায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, ড. আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পরে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মেয়র সাঈদ খোকন এবং এরপর উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়রও প্রদ্ধা নিবেদন করেন শহীদ বেদিতে। জিএম কাদের ও মশিউর রহমান রাঙ্গার নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতৃবৃন্দ শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

এরপর শহীদ বেদিতে সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী প্রধানরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে মহাপুলিশ পরিদর্শক পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল, আনসার গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক, ভাষা সৈনিকবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারবৃন্দ, বিদেশি সংস্থার প্রধানগণ শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের সঙ্গে ছিলেন। সেক্টর কমান্ডারবৃন্দ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আক্তারুজ্জামান তাঁকে স্বাগত জানান। বিশিষ্টজনদের শ্রদ্ধা জানানোর পর উন্মুক্ত হয় শহীদ মিনার। ফুলে ফুলে ভরে উঠে বাঙালির শোক আর অহংকারের এই মিনার। ভাষা শহীদদের স্মরণে গতকাল জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।

এদিকে ভোরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে মহান ভাষা শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানান।

ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি জেপি’র শ্রদ্ধা

মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গতকাল জাতীয় পার্টি জেপি যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ৩ দিনের কর্মসূচির প্রথম ২ দিন পালন করেছে। জেপি’র গৃহীত কর্মসূচির প্রথম দিনে বুধবার মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জেপি’র সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে দলের নেতা ও কর্মীরা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক এম. সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সহ-সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় যুব সংহতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল, শিক্ষা ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও জতীয় যুব সংহতির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আলম, যুগ্ম প্রচার সম্পাদক ও জাতীয় যুব সংহতির সহ-সভাপতি মঞ্জুর হাবিব মঞ্জু, জাতীয় যুব সংহতির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ নাজমুল হুদা প্রমুখ। দ্বিতীয় দিনে গতকাল সকাল সাড়ে ছয়টায় জাতীয় পার্টি-জেপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সকল কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন এবং কালো ব্যাজ ধারণ করা হয়। সকাল সাড়ে ৭টায় আজিমপুরে ভাষা শহীদের কবর জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এসময় নেতাকর্মীদের সঙ্গে জেপি’র সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। সকাল সাড়ে ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জেপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠন জাতীয় মহিলা পার্টি, জাতীয় যুব সংহতি এবং জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টির নেতা ও কর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তৃতীয় দিন আগামী রবিবার বিকাল ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাতীয় পার্টি-জেপি’র আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন দলের চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি।

আরো যারা শ্রদ্ধা জানান

অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জমানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, সাম্যবাদী দল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও সিনেট সদস্য, সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, গণফোরাম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, ছাত্রলীগ, যুব লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ছাত্র ইউনিয়ন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, গণতন্ত্রী পার্টি, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ভাষা শহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে অনেক বিদেশি নাগরিককে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেছে।