চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নি-কাণ্ডের ঘটনার পর হাসপাতালে খুঁজতে আসা কেউ কেউ স্বজনকে পেয়েছেন আহত অবস্থায়, আবার কেউ পেয়েছেন স্বজনের লাশ। মর্গের সামনে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ। চোখের জলে সিক্ত হয়ে উঠেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। কেউ ডুকরে কাঁদছেন। কেউ স্বজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। একজন আরেকজনকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাতেই তাদের কান্না থামানো যাচ্ছে না। এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ বা জরুরি বিভাগে গিয়েও অনেক নিখোঁজের সন্ধান পাওয়া যায়নি। জরুরি বিভাগ ও মর্গে যাদের পাওয়া যায়নি, তাদের সম্ভাব্য অন্যান্য জায়গায় খোঁজা হচ্ছে। পুড়ে অনেক নিহতের চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ। ডিএনএ টেস্ট করে নিশ্চিত হওয়া যাবে কার লাশ কোনটি।
গতকাল সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে দিয়ে দেখা যায়, নিহতদের স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে আছে পরিবেশ। স্বজনরা বিভিন্ন চিহ্ন ও আকৃতি দেখে লাশ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
গত বুধবার রাতে কয়েক দফা ঢামেকে খোঁজ করার পর বৃহস্পতিবার সকালে আবার এসেছেন বড়কাটারা মাদ্রাসার ছাত্র মো. আতাউর। তিনি জানান, তার শিক্ষক মাওলানা ওমর ফারুকের খোঁজ পাচ্ছেন না তিনি। আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবন ‘হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনে’ মাওলানা ফারুকের একটি ফার্মেসি ছিল।
স্বজনের খোঁজে মোবাশ্বর হোসেন এসেছেন ঢামেক মর্গে। তিনি জানান, তার বাবা হাজী মো. ইসমাইলকে পাওয়া যাচ্ছে না। বুধবার রাতে ঘটনার পূর্ব মুহূর্তে তাদের বাসার নিচে একটি দোকান থেকে চা খেয়ে হাঁটতে বের হন তিনি। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তার ব্যবহূত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মর্গের লাশগুলো এক এক করে তিনি দেখেছেন। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছেন না।
ভাইয়ের সন্ধানে গভীর রাত থেকে মর্গে অবস্থান করছেন অ্যাডভোকেট সুমাইয়া আক্তার। কান্না করতে করতে তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের হাত ভেঙে গিয়েছিল। তার হাতের ভেতর অপারেশন করে রড দেওয়া হয়েছে। শরীর পুড়ে গেলেও হাতের রড ও কোমরের বেল্ট দেখে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।
তুহিন নামের একজন কেঁদে মোবাইল ফোনে বলছেন, ‘আব্বা, আমি তুহিন, এনামুল পুইড়া মইরা গেছে। আমি আর রাজীব ঢাকা মেডিক্যালে এসে তাকে খুঁইজ্যা পাইছি।’ কাজী এনামুল হক অভি ঢাকা সিটি কলেজ থেকে বিবিএ পাস করে রূপালী লাইফ ইনস্যুরেন্সে চাকরি করছিলেন। এনামুলের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে। তিনি ওই এলাকায় থাকতেন। রাতে দাঁতের চিকিত্সা করাতে গিয়েছিলেন। সম্পর্কে তুহিনের ভাতিজা এনামুল।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত সিদ্দিকুল্লাহ চকবাজারে কসমেটিকসের ব্যবসা করতেন। তার বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে। তিনি বুধবার রাতে বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু তার আর বাড়িতে যাওয়া হয়নি। তিনি একটি হোটেলে খেতে বসেছিলেন। আগুন লাগায় আর বেরোতে পারেননি। তার ছেলে মোহাম্মদ বাবু (২০) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গের সামনে বসে বিলাপ করছিলেন।
একটি মসলা কোম্পানিতে কাজ করতেন মো. জুম্মন। তিনিও আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। তার দুই ছেলে রাশেদ ও রাব্বী। মর্গের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন রাশেদ। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘এতগুলো মানুষ পুড়ে মারা গেল। এটা সহ্য করার মতো নয়।’
