মাথাব্যথা, তাই মাথাটাই কাটিয়া ফেলিতে হইবে?

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:৫২

ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা লইয়া সম্প্রতি কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠী ব্যাপকভাবে সমালোচনামুখর হইয়াছেন। সর্বশেষ পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে গত বৃহস্পতিবার শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের পরাজিত মেম্বার প্রার্থী মালেক মালতকে পিটাইয়া হৎযা করিবার অভিযোগ পাওয়া গিয়াছে একই ওয়ার্ডের অপর পরাজিত মেম্বার প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন মালত ও তাহার সমর্থকদের বিরুদ্ধে। গত জুন হইতে এখন অবধি পাঁচ ধাপের নির্বাচনের প্রতি ধাপেই প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সংঘাতে অর্ধশতকের কাছাকাছি নিহতের ঘটনা ঘটিয়াছে। আহত হইয়াছেন কয়েক হাজার মানুষ। ইহাদের মধ্যে কেহ কেহ পরবর্তী সময়ে মারাও গিয়াছেন। অনেকেই সমালোচনা করিয়া বলিতেছেন, সন্ৎরাস ও সংঘাত যেন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের অনুষঙ্গ হইয়া উঠিতেছে। কাহারো মতে, চলমান সহিংসতার নেপথ্যে রহিয়াছে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এবং তাহাদের মতে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ফলে ব্যাপক দলীয়করণের মাধ্যমে প্রশাসন পক্ষপাতদুষ্ট হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও পক্ষপাতিৎবের কথা তাহারা বলিয়া থাকেন। এই জন্য তাহারা বলিতেছেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বন্ধ করা না গেলে সহিংসতা কমিবে না।

ইহাকে অবশ্য আরেক পক্ষ একপেশে সমালোচনা বলিতেছেন। প্রকৃত অর্থে, মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা দরকার। সেই দিক দিয়া দলীয় প্রতীকের কারণে ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়টি সর্বার্থে স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য নহে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ৎরিক দেশ ভারতের পঞ্চায়েত নির্বাচনে, যাহা আমাদের দেশে ইউপি নির্বাচনের সহিত তুলনীয়, ব্যাপক সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়া থাকে। কেবল পঞ্চায়েত কেন, ভারতে বিধানসভা কিংবা লোকসভা নির্বাচনেও ব্যাপক হামলা-হিংসা-বোমাবাজির ঘটনা ঘটিতে দেখা যায়। গত বৎসর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে আমরা দেখিতে পাইয়াছি, নির্বাচনে সহিংসতা কত প্রকার ও কী কী। এখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করিলে সহিংসতা দেখা দেয় বলিয়া কি বড় বড় পর্যায়ের নির্বাচনেও দলীয় প্রতীক বন্ধ করিবার সুপারিশ করা হইবে? মাথাব্যথার জন্য কি মাথাটাই কাটিয়া ফেলা হইবে? নির্বাচনে সহিংসতা কোথায় নাই? সারা বিশ্বেই ছোট-মেঝ-বড় গণতান্ৎরিক দেশসমূহে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা আমরা দেখিতে পাই। তুলনামূলক উন্নত দেশসমূহে হয়তো সহিংসতা কম হয়, ইহার অন্যতম কারণ তাহাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি এবং আয়তনের তুলনায় তাহাদের লোকসংখ্যাও কম। সুতরাং শিক্ষিত একটি গণতান্ৎরিক দেশের নির্বাচন আর অল্পশিক্ষিত দেশের নির্বাচনে পার্থক্য তো থাকিবেই। এখন স্বল্পশিক্ষিত দেশ বলিয়া বৃহৎ গণতান্ৎরিক একটি দেশ কি নির্বাচনে সহিংসতার জন্য দলীয় ব্যবস্থাই তুলিয়া দিবে; নূতন করিয়া সবকিছু ঢালিয়া সাজাইবে? বিশ্বের সবচাইতে ক্ষমতাধর ও শক্তিশালী গণতান্ৎরিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তাহাদের গণতন্ৎরেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়াছে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিসট্যান্স (আইআইডিইএ)-এর এক রিপোর্টে প্রথমবারের মতো ‘ক্ষয়িষ্ণু গণতন্ৎরের’ দেশগুলির তালিকায় উঠিয়া আসিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। দেশটিতে কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মত প্রকাশ তথা বাকস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থতার কথা বলা হইয়াছে সেই প্রতিবেদনে।

সুতরাং আমাদের দেশে ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন মোটেই কোনো সমস্যা নহে। প্রকৃত অর্থে, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে নির্বাচনে সহিংসতার নেপথ্যে রহিয়াছে অশিক্ষা। আর অশিক্ষা রাতারাতি দূর হইবারও নহে। ৫০ বৎসর পূর্বে আমরা প্রায় শূন্য হইতে শুরু করিয়াছি। বহু দূর যাইতে হইবে। আমরা অল্প অল্প করিয়া আগুয়ানও হইতেছি। আমাদেরও শিক্ষার হার আরও বাড়িবে, চক্ষু খুলিবে। অর্থনৈতিক উন্নতির গ্রাফ উপরের দিকে উঠিবে। বিশ্ব এখন বিশ্বগ্রাম। আমাদের দেশের সাধারণ পর্যায়েরও বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন প্রায়শই উন্নত দেশসমূহে ঘুরিতে যায়। তাহাতে তাহাদের দৃষ্টি প্রসারিত হইতেছে। সুতরাং এখনই এত অধৈর্য হইবার কিছু নাই। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন