গত সাপ্তাহে ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন’ লেখাটি সম্পর্কে বেশ কিছু প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। ঢাকার সলিমুল্লাহ হলের এক জন ছাত্র বেনামে চিঠি লিখেছেন। টেক্সট মেসেজে বিরাট লম্বা চিঠি আমাকে পড়তে হয়েছে। তার কথাগুলি প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, ‘স্যার, বেনামে চিঠিটা লিখছি বলে আমার ওপর রাগ করবেন না। আপনি তো দেশের পরিস্থিতি জানেনই। আমি শুধু আপনার লেখা সম্বন্ধে দু-একটা কথা বলতে চাই। আপনি লিখেছেন, এ দেশের হিন্দুরা অধিকাংশই শেখ হাসিনার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু হিন্দু ছাড়া প্রগতিশীল মুসলমানরাও যে তার ওপর নির্ভরশীল, এ কথা আপনি জানেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে বিএনপির শাসনে আপনি কি দেশে ফিরতে পারতেন? দেশে আসতে পারতেন? আওয়ামী আমলে কয়েক বারই এসেছেন। আমাদের হিন্দু সমাজের আসল সমস্যা, তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও নয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে হিন্দুদের কিছু উচ্চ পদ দিতে পেরেছেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যুক্ত করতে পারেননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছর। কিন্তু এই ৫০ বছরে একজন হিন্দুও আওয়ামী লীগের সভাপতি হননি। একজন হিন্দুও রাষ্ট্রপতির পদে বসেননি। অথচ ভারতে তিন-চার জন মুসলমান রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। এমনকি বিজেপি ক্ষমতায় থাকাকালে বৈজ্ঞানিক আবুল কালামকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য, হিন্দুরা দেশের জনসংখ্যার পঁচিশ ভাগ ছিল, আজ সম্ভবত আড়াই কিংবা তিন ভাগ আছে। সামরিক বাহিনীতে যদি হিন্দু মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তভুর্ক্ত করা হতো, তাহলে হয়তো একাধিক সামরিক অভু্যত্থান ঠেকানো যেত। এটা আমার বিশ্বাস। শুধু হিন্দু নয়, সব সংখ্যালঘুকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত না করলে তাদের নির্ভরতা এক ব্যক্তির ওপর থাকবে। দেশে স্হায়ীভাবে থাকার সম্ভাবনা থাকবে না। স্বাধীন বাংলাদেশেও হিন্দুরা ভিটেমাটি ছেড়ে দিয়ে দেশ ত্যাগ করেছে। দেশে যদি পঁচিশ ভাগ হিন্দু থাকত, তাহলে আওয়ামী লীগকে ভোটের জন্য হেফাজতের সঙ্গে আপস করতে হতো না। শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নয়, আওয়ামী লীগ তাদের দলেও কোনো হিন্দুকে উচ্চ পদে বসায়নি। ভারতে কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন একাধিক মুসলমান। তাদের মধ্যে একজন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। কিন্তু আওয়ামী লীগে কখনো কোনো হিন্দু সভাপতি হননি। ভবিষ্যতে হবে, তা মনে হয় না।’
তার এই টিঠিটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আমি দেশে ফিরতে পারব না। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন বলেই একাধিকবার দেশে যেতে পেরেছি। কিন্তু এখন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, বিএনপি হয়তো আবার ক্ষমতায় আসতে পারে। যদি আসে, তাহলে দুর্বৃত্ত তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হবে। আর তাহলে তা হবে আফগানিস্তানে বাচ্চা ই সাকাও-এর সিংহাসনে বসার মতো। আগামী নির্বাচনের প্রায় দুই বছর বাকি আছে। এই সময়ে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করা দরকার। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগকে গুরুত্ব দেননি। যদিও তিনি সভানেত্রীর পদে আছেন। তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন সরকারি ও বেসরকারি আমলাদের। যত দিন আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তত দিন দেশে একটা ভারসাম্যের অর্থনীতি ছিল। এখন তা নেই। দৃশ্যত দেশের যত দুর্নীতিবাজ, নব্য ধনী, তারা তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগে দেশ ছিল আধা পঁুজিবাদী। এখন তা পুরো পুঁজিবাদী দেশে পরিণত হয়েছে। ফলে দুর্নীতিও বেড়েছে। তার ওপর শেখ হাসিনার উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে আমলারা বহু টাকা মেরেছে। বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তিতে এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে যে বিরাট যাগযজ্ঞ হয়েছে, তাতেও প্রচুর টাকার হেরফের হয়েছে বলে শোনা যায়। আমার আবেদন, শেখ হাসিনা দলটাকে কঠোর হাতে পুনর্গঠন করুন। দলের শক্তিতেই তিনি ক্ষমতায় গেছেন। আমলাদের নয়। একশ্রেণির আমলা এখন প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে স্ত্ততিবাক্য ছড়াচ্ছে। তিনি ক্ষমতায় না থাকলেও বিএনপির তারেক রহমানেরও স্ত্ততি করবে তারা। যেমন করেছে জেনারেল জিয়াউর রহমানের।
রোগশঘ্যায় শুয়ে আমার একান্ত প্রার্থনা, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাক, দেশের পুঁজিবাদী উন্নয়ন অব্যাহত থাকুক। এছাড়া বাঙালির আর কোনো পথ নেই। বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত মহাজোটটিকে আবার গুরুত্ব দেওয়া। ছোট দলগুলো যতই ছোট হোক, দেশের সাধারণ মানুষের একটা অংশের ওপর তাদের প্রভাব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ রাখতে হবে, কোনো হেফাজতি যেন আওয়ামী লীগের ছদ্মবেশে নির্বাচিত হতে না পারে। আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত না করলে, হাইব্রিডদের দল থেকে দূর না করলে আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনা নিজে বিরাটসংখ্যক ভোট লাভ করবেন, কিন্তু আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপিদের মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগের বিপর্যয় ঘটবে। শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য জাতীয় সংসদে দলের সদস্য খুঁজে পাবেন না। ইউনিয়ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যেভাবে পরাজয় হয়েছে, কোনো কারচুপি না হলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একই অবস্হা হতে পারে। দলের যারা মনোনয়ন পাবেন না, তাদের অনেকে বিদ্রোহ করবেন। এবং নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনীত ব্যক্তিকে পরাজিত করবেন। আওয়ামী লীগ শক্তিশালী না হলে শেখ হাসিনাকে এই বিদ্রোহীদের আওয়ামী লীগের চাপ দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করতে হবে। আগামী নির্বাচনে জয় কি প্রার্থী হবেন? তার বয়স হয়েছে, রাজনীতিতে তাকে যুক্ত করতে হলে এটাই সময়। তাকে রংপুরে তার পিতার কেন্দ্রে মনোনয়ন দেওয়া উচিত। তিনি প্রচারকার্যে নামলে বাংলাদেশের রাজনীতির খঁুটিনাটি বুঝবেন। তা না হলে তিনি শুধু দেশে টেকনোক্র্যাট হয়ে থাকবেন। এ প্রসঙ্গে মুঘল আমলের একটা কথা বলি, মুঘল বাদশা আকবর দেশের হিন্দু-বৌদ্ধদের সমর্থন আদায়ের জন্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কোনো মুঘলকে নয়, রাজপুত মানসিংহকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। ফলে রাজপুতদের সমর্থন লাভ করেন। তিনি নিজে রাজপুত রমণীকে পত্নী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং বড় বড় উচ্চপদে রাজপুতদের নিয়োগ করেন। মানসিংহ প্রধান সেনাপতি হয়ে তার বিদ্রোহী স্বজাতি প্রতাপসিংহকে যুদ্ধে পরাজিত করে তার ধ্বংস সাধন করেন। আকবরের নীতি অনুসরণ করলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হিন্দুদের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করত। সম্রাট আকবর মানসিংহকে প্রধান সেনাপতি করায় রাজপুতদের আস্হা তিনি পান। সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃতু্যর পর তার পত্নী নূরজাহান দেশে একটা সামরিক অভু্যত্থান ঘটিয়ে জাহাঙ্গীরের এক পুত্র খসরুকে সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। কারণ রাজপুতরা এবং প্রধান সেনাপতি মানসিংহ জাহাঙ্গীরের অপর পুত্র খুররম অথবা শাহজাহানের পক্ষ গ্রহণ করেছিলেন। তার একটা কারণ ছিল। শাহজাহানের জন্ম জাহাঙ্গীরের রাজপুত পত্নীর গর্ভে। ফলে রাজপুতরা তাকে অধিক গ্রহণযোগ্য সম্রাট মনে করেছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগের শক্তির একটা স্তম্ভ হতে পারত, কারণ অধিকাংশ সংখ্যালঘু ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বাস করতে চায়, একটি ধর্মান্ধ দেশে নয়। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্যদের জন্য জিয়াউর রহমান ধর্মীয় শুরা প্রবর্তন করেছিলেন। তখন সংখ্যালঘুদের পক্ষে শপথগ্রহণ দুরূহ হয়ে উঠেছিল। আজ বাংলাদেশ ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে। আমি আওয়ামী লীগের জয়লাভ কামনা করি। সেই সঙ্গে এটাও আমার প্রার্থনা, শেখ হাসিনা তার দলকে সংশোধন করুন এবং বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের আদর্শরূপে গ্রহণ করুন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকার সময় এটাই করেছিলেন। আশা করি, বঙ্গবন্ধুকন্যা পিতার পথ অনুসরণ করবেন।
লন্ডন, ৭ জানুয়ারি ২০২২

