কথায় বলে, স্মল ইজ বিউটি। অর্থাৎ ক্ষুদ্রই সৌন্দর্য; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের সরকারের আকৃতির ক্ষেত্রে এই কথার বিপরীত চিত্রই দেখিতে পাওয়া যায়। এইখানকার অধিকাংশ দেশই ‘বিগ গভর্নমেন্ট’ নীতিতে বিশ্বাসী। যেই দেশের সরকার যত বড়, সেইখানে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগও অধিক। সেইখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অদক্ষতায় জনগণের ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই সকল দেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং ইহার অধীনস্হ দপ্তর, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বলা হয়, নাগরিকদের সুবিধার জন্য এই প্রশাসনিক সম্প্রসারণ। প্রকৃতপক্ষে ইহার মাধ্যমে নাগরিকদের পদে পদে ভোগান্িতই শুধু বাড়ে। দীর্ঘসূত্রিতা এবং সময়ক্ষেপণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয় সাধারণ নাগরিক হইতে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাগণ। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা হইতে যে কোনো ছোটখাটো নির্দেশনা এবং সিদ্ধান্ত পাওয়ার বেলাতেও পোহাইতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। ঘাটে ঘাটে দিতে হয় ঘুষ, নতুবা কার্যসিদ্ধি হয় না। এই জন্য উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহে অন্য যেই কোনো শিল্প বিকশিত হউক আর না হউক, করাপশন ইন্ডাস্ট্রি বা দুর্নীতি শিল্প যে খুব ভালোভাবেই বিকশিত হইতেছে তাহা বলাই বাহুল্য। প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের অনুপ্রবেশে মানুষের জীবনে উঠে নাভিশ্বাস।
আমরা দেখিতে পাই উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহে প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা এবং দুর্নীতি এক প্রকার কালচারে পরিণত হইয়াছে। অর্থ এবং ঘুষ প্রদান ছাড়া এইখানে কিছুই করা সম্ভব নহে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর এবং সংস্থার টেবিলে মাসের পর মাস ফাইল পড়িয়া থাকে, উৎকোচ ব্যতীত উহা নাড়ানো যায় না। এইখানেই শেষ নহে—এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার মতো উন্নয়নশীল দেশের সরকারই হইতেছে সবচাইতে বড় নিয়োগকর্তা। ইহা জনগণের জন্য কতটা বোঝাস্বরূপ তাহা কেহ ভাবিয়া দেখেন না। ইহার ফলে ভ্যাট ও ট্যাক্স কত প্রকার ও কী কী তাহা এই সমস্ত দেশে না আসিলে বোঝা সম্ভব নহে। ইনডাইরেক্ট ও অ্যাডভান্স ট্যাক্সসহ বিবিধ ট্যাক্স দিতে দিতেই দিশেহারা সাধারণ মানুষ। ইহার পরও উন্নয়নশীল বিশ্বে যেই সকল উদ্যোক্তা উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগ করিয়া থাকেন তাহাদের সামলাইতে হয় নানা প্রতিকূলতা। এই সকল দেশের নীতিনির্ধারকগণ বড় গলায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনের অতীত রেকর্ড ছাড়াইয়া যাইবার প্রচার-প্রচারণা চালাইলেও দেখা যায় শিল্প-কলকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিতেছে, বাধাগ্রস্ত হইতেছে উৎপাদন। অন্যদিকে সরকারি খাতের বিভিন্ন সংস্থা বত্সরের পর বৎসর লাভের মুখ না দেখিলেও জনগণের টাকায় সেই হাতি পোষা হইতেছে। স্মল গভর্নমেন্ট হইলে এত অপচয়ের আশঙ্কা থাকে না।
উন্নত বিশ্বের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে দেখা যায়, সেইখানে সরকারের আকার ছোট। অর্থাত্ সীমিত সরকারব্যবস্থার মাধ্যমেই পরিচালিত হইতেছে এই সকল দেশ। এই সকল দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণকে উৎসাহিত করা হইতেছে। তাহাদের মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সরকারি বিভাগের সংখ্যাও কম। যেইখানে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী দেশসমূহ এই নীতি অবলম্বন করিতেছে, সেইখানে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহ কেন বৃহত্ সরকারের ধ্যানধারণা নিয়ে বসিয়া আছে তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। ইহা গরিবের ঘোড়া রোগ ব্যতীত আর কিছু নহে। এই সকল দেশে খাজনার চাইতে বাজনাই অধিক এবং বাজেটের একটি বৃহত্ অংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধার পিছনেই ব্যয় হইয়া যায়। ফলে উন্নয়নমূলক খাতে বরাদ্দের পরিমাণ আশানুরূপ নহে। যাহা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহা আবার দুই-তিন বার কাটছাঁট করিয়া সংশোধন করা হয়। সরকারের আকৃতি ছোট হইলে এমন পরিস্হিতির সৃষ্টি হইত না। বিশেষজ্ঞরা বলিয়া থাকেন, স্মল গভর্নমেন্ট বা সীমিত সরকারব্যবস্থাই দক্ষ এবং অধিকতর ব্যবসায়-বাণিজ্যবান্ধব। উন্নয়নশীল দেশসমূহে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারকেই যেইহেতু প্রাধান্য দেওয়া উচিত, সেই জন্য এই সকল দেশে স্মল গভর্নমেন্ট গড়িয়া তুলিবার প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করিতে হইবে।
