ক্যানসার চিকিৎসায় সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২২, ০৪:০৭

বিষয়টি এখন সবাই জানে, একটি পরিবারে ক্যানসার আক্রান্ত একজন রোগী থাকা মানেই সেই গোটা পরিবারটিরই চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে করতে হতদরিদ্র পরিবারের কাতারে চলে যাওয়া। অনেক ভালো চিকিৎসার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিটি শেষমেশ মারাই যান। আর, আক্রান্ত পরিবারটি একদিকে সীমাহীন পারিবারিক কষ্টে থাকে, অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে গোটা পরিবারটিই দিশেহারা ও বেসামাল হয়ে পড়ে।

সত্যিকার অর্থেই চিকিৎসাক্ষেত্রে ক্যানসার একটি ভীতিজনক রোগের নাম। এই রোগটি শরীরে বাসা বাঁধলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শেষ পর্যায়ে ধরা পড়ে। একেবারে শেষ পর্যায়ে ধরা পড়ার কারণে বেশির ভাগ রোগীই মারা যান। অথচ আক্রান্ত হওয়ার শুরুতেই যদি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নির্ণয় করা সম্ভব হয়, তাহলে খুব অল্প খরচে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হতে পারেন।

বড় একটি সমস্যা হচ্ছে, দেশে মোটামুটি ভালো মানের ক্যানসার চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়—এরকম হাসপাতাল আছে হাতে গোনা। এই হাসপাতালগুলির অধিকাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় দিন দিন রোগীর চাপ বেশি হচ্ছে এবং রোগীরা ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে বিদেশমুখী হয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। দেশে বেসরকারি কিছু হাসপাতালে মানসম্মত ক্যানসার চিকিৎসা দেওয়া হলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশের অধিকাংশ মানুষ এসব হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন না।

অন্যদিকে, পরিসংখ্যান বলছে, দিন যতই যাচ্ছে দেশে ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা ততই বেড়ে চলেছে। প্রতি বছর গড়ে দেড় থেকে ২ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং এদের মধ্যে এক থেকে দেড় লাখ আক্রান্ত মানুষই এই রোগটিতে ধঁুকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বছরে বছরে এই বিপুলসংখ্যক পরিবার নিঃস্ব ও দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্স অন ক্যানসার (আইএআরসি)-এর সাম্প্রতিক প্রকাশিত অনুমিত হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে মারা যান ১ লাখ ৮ হাজার এবং এই সংখ্যা প্রতি বছর বেড়ে‌েই চলছে। এই সংস্থার মতে, বাংলাদেশ ক্যানসার আক্রান্তের হার প্রতি লাখে ১০৫.৭ এবং মৃতু্যহার প্রতি লাখে ৭৭.১।

অনানুষ্ঠানিক অন্য এক জরিপে দেখা গছে, এই অনুমিত ক্যানসার রোগীদের এক-তৃতীয়াংশ দেশের স্বীকৃত চিকিৎসাসেবার আওতায় আসে। বাকিদের একটা বড় অংশ বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন কিংবা নানা অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিচ্ছেন। ফলে ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বিপুলসংখ্যক রোগী। গত দুই দশকে দেশে সরকারি খাতে ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটেছে লক্ষণীয়ভাবে। ঢাকার মহাখালীস্থ জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে শঘ্যাসংখ্যা প্রথমে ৫০ থেকে ৩০০-তে উন্নীত করা হয়েছে এবং এর পর আরো ৫০০ শঘ্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যেখানে রেডিওথেরাপির আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযুক্ত হয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও ঢাকার বাইরে বগুড়াতে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সর্বাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন সংযুক্ত হয়েছে। পুরোনো আটটি বিভাগীয় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গভাবে সবগুলিতে ক্যানসার বিকিরণ চিকিৎসা, কেমোথেরাপির ব্যবস্থা চালু নেই। বেসরকারি খাতে কয়েকটি বড় হাসপাতালে রেডিওথেরাপিসহ ক্যানসার চিকিৎসা চালু হয়েছে, যেখানে অনেক সচ্ছল রোগী চিকিৎসা নিতে পারছেন, যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে। একমাত্র জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ছাড়া সরকারি-বেসরকারি কোনো বিশেষায়িত ক্যানসারসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এখন পর্যন্ত ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থা রাজধানীকেন্দ্রিক। তাই সরকারিভাবে চিকিৎসার জন্য দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়। উপরন্তু ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী সামর্থ্য না থাকলেও বাধ্য হয়ে বিদেশি কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসাসুবিধা রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় এবং ক্যানসার রোগ সম্পর্কে জনগণের অজ্ঞতা, অসচেতনতায় রোগ নির্ণয় বিলম্বিত হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল পাওয়া সম্ভব হয় না।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার নির্ণয়ের এক বছরের মধ্যে শতকরা প্রায় পঁচাত্তর ভাগ রোগী মারা যান, কিংবা ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হন। এমতাবস্থায়, দেশের অধিকাংশ মানুষের ভৌগোলিক ও আর্থিক অবস্থার নাগালের মধ্যে ক্যানসারসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্যানসার রোগীর সঠিক পরিসংখ্যান এবং জনগোষ্ঠীভিত্তিক বা পপুলশনভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রির মাধ্যমে ক্যানসারে আক্রান্তের হার, মৃতু্যহারসহ গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত পাওয়া সম্ভব, যা সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ২০০৪ সালে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টটিটিউট হাসপাতালে ও ১৯টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসার নিবন্ধন কার্যক্রম স্বল্প পরিসের শুরু হয়েছে। কিন্তু জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যানসার নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া উল্লিখিত তথ্য-উপাত্ত পাওয়া সম্ভব নয়।

ক্রমান্বয়ে ক্যানসার চিকিৎসায় একদিকে ঢাকার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমানোর তাগিদ, অন্যদিকে এই ক্যানসার চিকিৎসায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে দরিদ্র হয়ে যাওয়া ঠেকানোর বিষয়টি সরকারের মাথাব্যথা হয়ে দেখা দেয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জাহিদ মালেক ২০১৮ সালে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্যানসার চিকিৎসায় দেশব্যাপী চিকিৎসাসেবা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে নির্দেশনা দেন। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লাগে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্ব অনুধাবন করে দেশের আটটি বিভাগেই আটটি ১৫তলাবিশিষ্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ক্যানসারের পাশাপাশি সেখানে কিডনি, লিভার এবং ডায়ালাইসিস-সুবিধা রাখার জন্যও আলাদা ব্যবস্থা রাখার বিষয়টি অন্তভু‌র্ক্ত করা হয়। ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অবশেষে জুলাই, ২০১৯ থেকে প্রকল্প আকারে বাস্তবায়ন করতে কাজ শুরু হয়। কাজ শেষ করা বা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সময় নির্ধারণ করা হয় জুন ২০২২ পর্যন্ত। প্রকল্পটি গত ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ খ্িরষ্টাব্দ তারিখে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় অনুমোদিত হয় এবং ১১ নভেম্বর, ২০১৯ তারিখে প্রকল্পটি প্রশাসনিক অনুমোদন লাভ করে। প্রকল্পটির সার্বিক উদ্দেশ্য হচ্ছে—

১। সারা দেশে ক্যানসার রোগে আক্রান্ত বিশাল জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা;

২। সূচনাতেই ক্যানসার রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা;

৩। ক্যানসার চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ ও বিকেন্দ্রীয়করণের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা;

৪। ক্যানসার চিকিৎসাসেবায় বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে আনা, পক্ষান্তরে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা;

৫। ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে জনগণের ব্যয় হ্রাস করা;

৬। দেশে ক্যানসার চিকিৎসাসেবা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।

সর্বোপরি আট বিভাগে আটটি উন্নত মানের ক্যানসার, কিডনি, লিভার চিকিৎসা হাসপাতাল নির্মাণ নিঃসন্দেহে সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী ও ফলপ্রসূ চিন্তার ফসল হয়ে দেখা দেবে বলে দেশের বিজ্ঞজনেরা মনে করছেন। হাসপাতালগুলি নির্মাণকাজের অগ্রগতি এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আজ ৯ জানুয়ারি, ২০২২ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালগুলির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করবেন। আশা করা যাচ্ছে, নির্ধারিত সময়েই হাসপাতালগুলি কার্যক্ষম হয়ে উঠবে। হাসপাতালগুলির প্রতিটিতেই প্রথম অবস্থায় অন্তত ১০০টি করে ক্যানসার শঘ্যার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা থাকবে। এর পাশাপাশি সমহারে কিডনি, লিভার চিকিৎসার জন্যও শঘ্যা থাকবে। এগুলি প্রস্ত্তত হয়ে গেলে ক্যানসার চিকিৎসায় ঢাকার ওপর চাপ অনেকাংশই কমে যাবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। সাধারণ মানুষজন ঢাকায় এসে চিকিৎসা করাতে অতিরিক্ত টাকা খরচ করার পাশাপাশি চিকিৎসাসংক্রান্ত ভোগান্িতর হাত থেকেও বেঁচে যাবেন। হাসপাতালগুলি চালু হলে একদিকে দ্রুততার সঙ্গে রোগটিকে প্রথম পর্যায়েই নির্ণয় করা যেমন সহজ হবে, অন্যদিকে চিকিৎসাসেবায় জটিল ও ভীতির এই রোগটির চিকিৎসায় দেশের প্রান্িতক মানুষ অনেকটাই স্বস্তির শ্বাস নিতে শুরু করবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন