সমগ্র দেশে তীব্র গ্যাস-সংকট দেখা দিয়াছে। রাজধানীর রামপুরা, মিরপুর, ধানমন্ডি, পুরাতন ঢাকা, যাত্রাবাড়ী প্রভৃতি এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকটে জ্বলিতেছে না চুলা। ইহাতে গৃহিণীরা পড়িয়াছেন বিপদে। গ্যাসের চুলা বাসায় পড়িয়া রহিয়াছে। তাহারা বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করিতেছেন সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলা। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার বসতবাড়ির চিত্র ইহাই। তবে শুধু আবাসিক নহে, কলকারখানা, সিএনজি স্টেশন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সকল খাতেই গ্যাসের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছে। ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ শিল্পকারখানা দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকিতেছে। কারখানার মালিকরা বলিতেছেন, সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ যেইখানে ১৫ পিএসআই (প্রেসার পার স্কয়ার ইঞ্চি) থাকিবার কথা, সেইখানে পাওয়া যাইতেছে তিন-চার পিএসআই। এভাবে কি কারখানা চালু রাখা সম্ভব? সিএনজি স্টেশনগুলির লাইনে প্রেশার দুই-তিন পিএসআই। এই সংকটের কারণে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হইতেছে। এই জন্য সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস রেশনিং করা হইতেছে। পেট্রোবাংলা স্বীকার করিয়াছে যে, সরবরাহ কম থাকায় দেখা দিয়াছে এই সংকট। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভিমত, এই সংকট আরো মাসখানেক থাকিতে পারে। তাহার মানে এই শীতকালে গ্যাসের সংকট আর স্বাভাবিক হইবার কোনো সম্ভাবনা নাই।
পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪৫০ কোটি ঘনফুট। অথচ সরবরাহ করা হইতেছে ২৮৫ কোটি ঘনফুট। বত্সরখানেক পূর্বেও পরিস্হিতি কিছুটা ভালো ছিল। তখন সরবরাহ করা হইত ৩৩০ হইতে ৩৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এই যে বিশাল ঘাটতি তাহা পূরণ হইবে কীভাবে? জ্বালানিসংকটে, বিশেষ করিয়া কলকারখানার মালিকদের অবস্হা সঙ্গিন। তাহারা কাঙ্ক্ষিত হারে পণ্য উত্পাদন করিতে না পারিয়া লোকসান গুনিতেছেন। পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের মালিকরা পড়িয়াছেন আরো বিপাকে। রপ্তানিকারকদের অবস্হা শোচনীয়। তাহাদের রপ্তানি আদেশ বাতিল হইবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। জ্বালানি সংকটের সমাধান মিলিতেছে না দিনের পর দিন। অথচ ব্যাংক ঋণের সুদের চাকা ঠিকই ঘুরিতেছে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ঠিকই লাগিতেছে। এই সংকটের কারণ হইল, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলি হইতে কমিয়া গিয়াছে গ্যাসের উৎপাদন। ইহার পাশাপাশি গত জুন হইতে কমিয়া গিয়াছে এলএনজি তথা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানিও। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সরাসরি এলএনজি ক্রয় বন্ধ রহিয়াছে। ইহা ছাড়া শীতকালে পাইপলাইনে গ্যাস জমিয়া যায়। পুরাতন লাইনে ছিদ্র থাকিলেও দেখা দিতে পারে গ্যাসের সংকট। তবে মূল সমস্যা হইল চাহিদার তুলনায় গ্যাসের উৎপাদন বা আমদানি কম।
আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করিলাম মহাসাড়ম্বরে; কিন্তু গত ৫০ বত্সরেও দেশের জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলায় পরিকল্পিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় নাই। বর্তমানে দেশে গ্যাসের প্রমাণিত বা সম্ভাব্য মজুত ১০ টিসিএফ। প্রতি বত্সর আমাদের ১ দশমিক ৩ বা ৪ টিসিএফ গ্যাস দরকার। এই জন্য ২০২০ সালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলিয়াছিলেন যে, আগামী ২০৩০ সালে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ফুরাইয়া যাইবে; কিন্তু ইহার পর কী হইবে? প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার গ্যাস উত্তোলনে কার্যকর পদক্ষেপ নিলেও আমরা এই ব্যাপারে তিমিরেই রহিয়া গিয়াছি। বঙ্গোপসাগরে তৈল ও গ্যাসের অনুসন্ধান কার্যক্রম কতটা চলিতেছে তাহা আমাদের অজানা নহে। এই ক্ষেত্রে আমরা কাজের চাইতে কেবল বাগাড়ম্বরই অধিক দেখিতে পাই। বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি খাত হইল গ্যাস। অতএব, জলে-স্হলে গ্যাস অনুসন্ধানে অচলায়তনের অবসান ঘটাইতে হইবে। এই সংকট মোকাবিলায় গ্রহণ করিতে হইবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা।
