মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ১১ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

ভোটের বহুবিধ মূল্য জনগণকে বুঝিতে হইবে

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:১৯

তৃতীয় বিশ্বে অনেক ধরনের নির্বাচনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আলামত দেখিতে পাওয়া যায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া মিডিয়ারও তীক্ষ্ণ-তীব্র ফোকাস থাকে, প্রার্থীদের বিপুল প্রচারণাও থাকে; কিন্তু জনগণের বিপুল অংশ যদি সেই নির্বাচনের প্রতি অনাগ্রহী হয়, উদাসীন হয়, নিরুৎসাহিত হয়, তবে নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হইবে কী করিয়া? দেখা যায় যে, জনগণ ঘরে বসিয়া বউয়ের নিকট সমালোচনা করিতে উৎসাহী; কিন্তু ভোটকেন্দ্রে যাইতে উৎসাহী নহে। একজন ভোটার ভোট দিতে না গেলে দুইটি ঘটনা ঘটে। তিনি যদি আমগাছ মার্কা প্রার্থীর সমর্থক হন, তাহা হইলে আমগাছ মার্কা প্রার্থী একটি ভোট কম পাইল। অন্যদিকে আমগাছের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীও একটি ভোট কম পাওয়া হইতে রেহাই পাইল।

এখন প্রশ্ন হইল—তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির বিপুলসংখ্যক জনগণের মনে এই যে ভোটের প্রতি বিরাগ তৈরি হইয়া থাকে—কেন এই অনীহা? কেন এই নিরুত্সাহতা? ইহা লইয়া আত্মজিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন; কিন্তু আত্মজিজ্ঞাসা না করিয়া কেবল ঘরে বসিয়া স্ত্রী-বন্ধুদের নিকট সমালোচনার তুফান ছুটাইলে তাহা অক্ষমের প্রলাপে পরিণত হইবে। তাহারা হয়তো মনে করিতে পারে, অমুক মার্কার প্রার্থীর অনেক আগ্রাসি কর্মী রহিয়াছে, সুতরাং তাহাদের পছন্দের বিপরীতে ভোট দিলে বিপদ হইবে। অথচ বাস্তবতা হইল, কর্মীদের তুলনায় সাধারণ জনগণের সংখ্যা হাজার গুণ অধিক। জনগণ যদি কাতারে কাতারে ভোটকেন্দ্রে যায়, তবে তাহাদের কে আটকাইবে? জনগণ যদি হয় ‘সূর্য’ তবে কর্মীরা হইল বালুকণা। সূর্যের চাইতে বালুকণার উৎতাপ আপাতভাবে অধিক মনে হইলেও সূর্যই সকল শক্তির উৎস। জনগণও তেমনি সকল শক্তির উৎস; কিন্তু জনগণ তাহা ভুলিয়া যায়। রামায়ণে আছে, লঙ্কায় যাইবার জন্য সমুদ্র পাড়ি দিতে রামের জন্য হনুমানকে ‘সেতু’ নির্মাণ করিতে হইয়াছিল; কিন্তু সমুদ্র পাড়ি দিতে হনুমানের কোনো সেতুর দরকার হয় নাই, ‘রাম-নাম’ লইয়াই সে সমুদ্র পাড়ি দিয়াছিল। জনগণও তেমনি ‘রামের মতো’, তাহাদের নাম ভাঙাইয়া ক্ষমতার ‘সেতু’ পাড়ি দেওয়া হয়; কিন্তু জনগণ স্বয়ং মনে করে, তাহার আর কী ক্ষমতা? এই জন্য অক্ষমের প্রলাপের মতো তৃতীয় বিশ্বের জনগণ ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে কেবল সমালোচনা করিয়া তৃপ্তি লাভ করিতে চাহে; কিন্তু ইহা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। কারণ, এইভাবে জনগণ যদি নিজের দেশ কিংবা নিজের ভোটের এলাকা লইয়া উদাসীন এবং অনীহায় ডুবিয়া থাকে তাহা হইলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসিবে না। জনগণকে বুঝিতে হইবে, তাহারা যদি ভোটকেন্দ্রে না যায়, তাহা হইলে নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে প্রকৃত লড়াই হইবে না। ভোটকেন্দ্রে না যাইবার ব্যাপারে তাহারা হয়তো বলিতে পারে, তাহাদের পছন্দের প্রার্থী নাই। ভালো বিকল্প নাই। হয়তো মনে করিতে পারে, আমগাছের পরিবর্তে জামগাছকে ভোট দিবে—কিন্তু জামগাছও এমন কী ভালো! ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর বিপুল সদস্যকে দেখিয়াও জনগণের মনে ভয়ের সঞ্চার হইতে পারে। এই সকল কারণে যদি জনগণের মনে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে অনীহা তৈরি হয়, তাহা হইলে তাহাদের মনে রাখিতে হইবে, তাহারা ভোটকেন্দ্রে না গেলে সেই সুযোগে যেই নৈরাজ্য সৃষ্টি হইবে, তাহাতে বিপদটা তাহাদেরই আরো বৃদ্ধি পাইবে। জনগণ নিশ্চয়ই নৈরাজ্য চাহে না।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে অতীত ইতিহাস ঘাঁটিয়া দেখা গিয়াছে, ফ্যাসিস্টরা চাহে জনগণ ভয় পাক। ঘরে বসিয়া জনগণ যত ইচ্ছা সমালোচনা করুক আর হাতিঘোড়া মারুক। রাজপথে কিংবা ভোটকেন্দ্রে জনগণ না আসিলেই হইল। স্পষ্টতই, যাহারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিশ্বাস করে না—জনগণ ভোটকেন্দ্রে না গেলে সেই স্বৈরতন্ত্রী-ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতায় আসিবার পথ সুগম করিয়া দেওয়া হয়। সুতরাং জনগণকে সচেতন হইতে হইবে, নিজের ভোটের বহুবিদ মূল্য বুঝিতে হইবে। ত্রিশের দশকে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং দেখিয়াছিলেন, ‘পেনিসিলিন’ শুধু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উৎপাত আটকায় না, সেই জায়গাটিকেও পরিষ্কার রাখে। ভোটও তেমনই পেনিসিলিনের মতো। উহা কেবল খারাপ প্রার্থীকে আটকায় না, ভালো প্রার্থীকেও জায়গা করিয়া দেয়। জনগণকে ইহা বুঝিতে হইবে। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সড়কে বিশৃঙ্খলা আর কত দিন?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ দায়িত্ব পালন

প্রতিশ্রুতি প্রদানে সতর্ক হওয়া উচিত

অস্পষ্টতা গুজব সৃষ্টির সহায়ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শৃঙ্খলাই পরিত্রাণের পথ

জনগণের প্রতিবাদ ও প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে

নিজেকে চিনিয়াছি কি?

বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের ভাবিয়া দেখা উচিত